fbpx
সাহিত্য

শেকল ভাংগার গান

বগুড়া সংবাদ ডট কম: এই যে চারিদিকে শুধু প্রতিবাদ আর প্রতিবাদের মিছিল। এইটা নেই, ঐটা নেই, এই হয়না, সেই হয়না, অমুক বলেনা কেন? তমুক কিছু করেনা কেন? ব্যাস; বলেই খাল্লাস! প্রতিবাদের ভাষায় যতোটুকু বলি সেটাও কখন বলি? ঠিক যখন আমি নিজেই সেই সমস্যার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বিপর্যস্ত হই এবং কোন সমাধান পাই না। বরং সমাধানের বিস্তির্ণ রাস্তায় কাঁটার আঘাতে আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হই, তখনই কেবল সেই নিয়ে হুলুস্থুর চিল্লাচিল্লি করি। এর আগ মহুর্তে আমার সামনে ঘটে যাওয়া বহু অন্যায়ে টু শব্দটি করি না। বরং সমস্ত অন্যায়ে যতোটা পারি গা বাঁচিয়ে চলি। এই যে আমাদের দীর্ঘদিনের গা বাঁচিয়ে চলার স্বভাব! এই স্বভাবের কারনেই কিন্তু সমস্যাগুলো, অন্যায় গুলো, অন্যায্য বিষয়াদি বীজ থেকে অঙ্কুরিত হয়ে ধীরে ধীরে এখন বিশাল বটবৃক্ষে পরিণত হয়েছে। আর সেই বিশাল বটবৃক্ষের সু-শীতল ছায়ায় গা শীতল করছে সমাজের কিছু সুবিধাবাদী মুখোশের আড়ালে থাকা মানুষ। যারা আপনার আমার গা বাঁচিয়ে চলার সুযোগ কে কাজে লাগিয়ে এই অন্যায়ের বটবৃক্ষকে সমাজের উপর মহীরূহে দখলদারিত্ব করতে সুযোগ করে দিয়েছে। সেই সাথে বটবৃক্ষের সকল সুযোগ সুবিধা নিজেদের দখলে রেখে আমাদের সামনে ভালো মানুষের মুখোশটি উচিয়ে রেখেছে। আমরা গা বাঁচিয়ে চলা মানুষগুলো সেই মুখোশের সৌন্দর্যে অবির্ভুত হয়ে নম নম মস্তকে তাদেরই পদাবনত হয়ে সেবা দিয়ে যাচ্ছি দীর্ঘকাল। কিন্তু এই নম নম আর গা বাঁচিয়ে চলা কতোকাল ধরে চলবে? আপনি ভাবছেন কই গা বাঁচিয়ে চললাম! এই তো সেদিনই গলা উঁচিয়ে কতো কি না বলে ফেললাম ওমুক সিস্টেমের অব্যবস্থাপনায়,তমুকের গোপন তথ্য ফাঁস হওয়ায়। কিন্তু যখন আপনি আক্রান্ত হয়ে গলা উঁচু করেছিলেন বা বড়সড় একটা লেখা ফেসবুক কিংবা টুইটারে দিয়েছিলেন তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। আপনার সেই প্রতিবাদের গলার আওয়াজ ইতিমধ্যেই অন্যায়ের সেই বিশাল বটবৃক্ষে গিয়ে কূলকিনারা তো পাচ্ছেই না বরং সজোরে ধাক্কা খেয়ে আপনার কাছেই ফিরে আসছে। ধরুন বর্তমান করোনা কালীন সময়ে আপনার মাকে এ হাসপাতাল সে হাসপাতাল নিয়েও চিকিৎসা করাতে পারলেন না তিনি মারা গেলেন। সন্তান কে নিয়ে এ ক্লিনিক সে ক্লিনিক ঘুরছেন কিন্তু চিকিৎসক পাচ্ছেন না। আপনার এই সেবা না পাবার দূরাবস্থায় আমি সত্যিই প্রচন্ড মর্মাহত। আপনার বা আপনার পরিবারের সাথে যে অন্যায়টি হলো আমি সেই অন্যায়ের তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি। এমনকি এও কথা দিচ্ছি যদি আপনি এই নিয়ে রাস্তায় নামেন তো আমাকেও সেই প্রতিবাদের মিছিলে প্রথম সারিতে পাবেন। এখন কথা হচ্ছে এই অব্যাবস্থাপনার বা অন্যায়ের দায় কিন্তু আপনি এড়াতে পারেন না।

এটা কোন ব্যক্তির ইচ্ছা অনিচ্ছার বিষয় নয়, বরং এটা দীর্ঘদিনের সিস্টেম এর ফসল। আপনার নীরবতা, গা বাঁচিয়ে চলার সুযোগে এটা দিনে দিনে বড় হয়েছে। এই গাছ আপনি লাগান নি কিন্তু, আপনার চোখের সামনে যখন বড় হয়েছে তখন আপনি টু শব্দটি পর্যন্ত করেননি। যখন আপনার মতোই কেউ একজন চিকিৎসার জন্য এ হাসপাতাল থেকে ও হাসপাতাল দৌড়াদৌড়ি করেছে তখন বারান্দার বেলকোনীতে দাঁড়িয়ে শুধু তামাশা দেখেছেন। কালেভাদ্রে হয়তো পরামর্শ দিয়েছেন এখানে পড়ে আছে কেন? বিদেশ নিয়ে চিকিৎসা করালেই তো পারেন, জানেন না এই দেশে চিকিৎসা বলে কিছু আছে? আবার যখন এই নিয়ে আপনার পাশের বাড়ির কেউ উচ্চ বাচ্য কিছু করেছে তাকে পাগল বলে মজা নিয়েছেন।এখন আপনি যখন আপনার চিকিৎসা সুবিধা না পাবার বিষয় নিয়ে কথা বলছেন ঠিক তখন আপনার পাশের বাড়ির কেউ আপনাকেও পাগলের সাথে তুলনা করতে দ্বীধা করছে না। আপনার বাড়ির বিদ্যুৎ, পানির বিল অযৌক্তিক ভাবে বাড়ছে, মালিককে সুবিধা দিতে লঞ্চ, বাসের ভাড়া বাড়ে আপনি সব মুখবুজে মেনে নেন আর মনে করেন এটার প্রতিবাদ করবে অমুক রাজনৈতিক দল, ওটার প্রতিবাদ করবে তমুক রাজনৈতিক দল, সেটার প্রতিবাদ তমুক সংগঠন, সরকারের সমালোচনা করবে সুশীলজন, আর আপনি বৌ বাচ্চা নিয়ে ফুচকা খাবেন, সেলফি দিবেন বিদেশ ভ্রমনে ব্যস্ত সময় পার করবেন। এসব বিষয়ে কথা বলার মতো আপনার হাতে সময় কই? বরং আপনি টাকা কামানোর মেশিন হয়ে নিজেকে গর্বিত করবেন আর যারা এই নিয়ে কথা বলবে তাদের মিছিলের লোক গুনে গুনে বলবেন এতো কম মানুষ! আসলে সমাজ আপনা আপনি সভ্য হয়না বা বদলায় না।একে সভ্য করতে হয় বদলাতে হয়। আর সমাজকে সভ্য করার ,বদলানোর দায়িত্বটা আপনার আমার আমাদের সকলের। বুকে হাত রেখে বলুন তো সমাজকে সভ্য করতে কি একমিনিট সময়ও আপনি খরচ করেছন? করেননি। মনে রাখা দরকার আপনার বাপ দাদার আমল থেকেই এই গা বাঁচানোর স্বভাব সুলভ আচরণের ফসল হচ্ছে এই সিস্টেম বা অব্যাবস্থাপনা। আসলে সমাজের অব্যাবস্থাপনায়, কিংবা অন্যায়ে ঘা দিতে হয়। প্রচন্ড জোরে আঘাত করতে হয় যতোটা আপনার শক্তি স্বামর্থ্য আছে। আপনার সামনে অন্যায়ের দেয়ালটি ভাঙ্গার দায়িত্ব আপনাকেই নিতে হবে। কেউ আপনাকে এই দায়িত্ব যেচে দেবে না বা আপনি কারো কাছেই এই দেয়াল ভাঙার জন্য কোন পারিশ্রমিকও পাবেন না। এমনকি এও হতে পারে আপনি যখন অন্যায়ের দেয়ালে আঘাত করছেন তখন পাশের কেউ সাহায্য তো দূরে থাক বরং উলটো আপনাকে পাগল বলে তাচ্ছিল্য করছে। এটি আপনাকে সয়ে নিতে হবে! কিন্তু আপনি কখনো সমাজকে আঘাত করার কাজটি তো করেননি। চোখের সামনে শত শত অনিয়মে আপনার ভূমিকা কি? নিজেকে প্রশ্ন করেছেন কখনো? বরং সেই অন্যায়টি দিয়ে যদি আপনার সুবিধা হয় তবে সেটিকে স্ব ইচ্ছায় প্রশ্রয় দিয়ে ফুলে ফেপে বড় হতে দিয়েছেন। অন্য কেউ আঘাত করবে আর আপনি ঘরে বসে বসে তার বেনিফিট ভোগ করবেন তখন একটু যন্ত্রনা তো আপনাকে মেনে নিতেই হবে। কে শুরু করলো কি করলো না, কেউ কিছু বললো কি বললো না সেটি না ভেবে বরং আপনিই শুরু করুন। দেখবেন একদিন আপনাকে দেখে আরো দশজন এগিয়ে আসবে। সেই দশজন কে দেখে আরো দশজন। এভাবে একদিন শত শত মানুষ অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে শিখবে। যা আপনার বিবেচনায় অন্যায় সেটাকে কোন রকম ছাড় না দিয়ে উচু গলায় বলুন এটা অন্যায়। একবার বলাতে কাজ না হলে দশবার বলুন, দশবারে কাজ না হবে পঞ্চাশ বার বলুন, দেখবেন একসময় ঠিকই সেই শব্দ অন্যায়ের উচু বটবৃক্ষ জয় করবেই করবে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে, অন্যায্যতার বিরুদ্ধে নিজের শিরদাঁড়া সোজা করে শক্ত গলায় কথা বলতে শিখুন দেখবেন আপনার সন্তান এই শক্ত গলার আওয়াজের সুফোল ভোগ করবে।

তাহলে চলুন আজ থেকেই শুরু করি ——-

এম এম মেহেরুল
লেখক ও সাবেক চেয়ারম্যান, আলোর প্রদীপ,উপ-সম্পাদক,বাঙালি বার্তা
ই-মেইলঃ meharul.islam.1991@gmail.com

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

four × two =

Back to top button
Close