বগুড়া সংবাদ ডট কম(ধুনট প্রতিনিধি ইমরান হোসেন ইমন): ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে জালাল উদ্দিনের বয়স ছিল ১০ বছর ২ মাস ২৫ দিন। কিন্তু তারপরও তিনি বয়স জালিয়াতি করে প্রায় ৭/৮ বছর একটানা বগুড়ার ধুনট উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কামান্ডারের দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০১০ সালের জুলাই মাস থেকে গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত ৪ লাখ ২৬ হাজার সম্মানী ভাতা পেয়েছেন ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা জালাল উদ্দিন। শুধু তাই নয় একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে তার ছেলেদের সরকারী চাকুরি সহ বিভিন্ন সুযোগ সুবিধাও গ্রহণ করেছেন তিনি। তবে সম্প্রতি তার বয়স জালিয়াতি প্রমাণিত হওয়ায় জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের ৫১তম সভায় সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার জালাল উদ্দিনের মুক্তিযোদ্ধা সনদ ও গেজেট বাতিল করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। তবে দীর্ঘদিন পর জালাল উদ্দিন ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা প্রমাণিত হওয়ায় স্বস্তি ফিরে এসেছে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের মাঝে।
মুক্তিযোদ্ধা মতিয়ার রহমান ও মহসীন আলী বলেন, জালাল উদ্দিন ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সেজে দীর্ঘ ৭/৮ বছর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডের দায়িত্ব পালনকালে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের নানা প্রকার হয়রানী করেছেন। একারনে হয়রানীর শিকার মুক্তিযোদ্ধারা সাবেক কমান্ডার জালাল উদ্দিনের এসএসসি পাশের সনদ ও ভোটার আইডি কার্ড সংগ্রহ করেন। কিন্তু এসএসসির সনদ ও ভোটার আইডি কার্ডে জালাল উদ্দিনের জন্ম তারিখ ১৯৬১ সালের ২ জানুয়ারী। সে হিসাবে তার ১০ বছর ২মাস ২৫ দিন। তাই মুক্তিযুদ্ধের সময় ১০ বছর বয়সী বালক কিভাবে মুক্তিযুদ্ধ করেছে বিষয়টি স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে সন্দেহের সৃষ্টি হয়। এবিষয়ে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রনালয় সহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা জালাল উদ্দিনের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করে। কিন্তু তারপরও জালাল উদ্দিন স্থানীয় প্রভাবশালীদের ম্যানেজ করে মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডারের পদ আকড়ে ধরে রেখে সরকারী ভাতা সহ সকল সুযোগ সুবিধা ভোগ করতে থাকেন। পরবর্তীতে এবিষয়ে আরেক মুক্তিযোদ্ধা আমিনুল ইসলাম জালাল উদ্দিনের বয়স জালিয়াতির সকল প্রমানপত্র সংযুক্ত করে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের মন্ত্রী আ,ক,ম মোজাম্মেল হকের কাছে ২০১৭ সালের ২ মে একটি অভিযোগপত্র দেন। মন্ত্রী যাছাই করে নীতিমালা অনুসারে ব্যবস্থা নিতে ধুনট উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে নির্দেশ দেন। উপজেলা নির্বাহী অফিসার সমাজ সেবা অফিসারকে তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করেন। সমাজ সেবা অফিসার ওবাইদুল হক তদন্ত করে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ জালাল উদ্দিনের বয়স ১০ বছর ২ মাস ২৫ দিন এর সত্যতা পেয়ে একটি প্রতিবেদন দাখিল করেন। ওই প্রতিবেদন সহ বগুড়ার ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক সুফিয়া নাজিম গত বছরের ১৪ নভেম্বর ভূয়া মুক্তিযোদ্ধা জালাল উদ্দিনের সনদ বাতিল সহ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে একটি পত্র প্রেরণ করেন। ওই মন্ত্রণালয়ের ৫১ তম সভায় জালাল উদ্দিনকে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে আখ্যায়িত করে তার সনদ ও গেজেট বাতিল করেন। এরপর গত ৩ মার্চ রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব মতিয়ার রহমান স্বাক্ষরিত জালাল উদ্দিনের সনদ ও গেজেট বাতিলের প্রজ্ঞাপন জারি করেন।
উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা ওবায়দুল হক বলেন, ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা জালাল উদ্দিন ২০১০ সালের জুলাই মাস থেকে গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত ৪ লাখ ২৬ হাজার সম্মানী ভাতা পেয়েছেন। এছাড়াও একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে ছেলেদের সরকারী চাকুরি সহ বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা গ্রহণ করেছেন।
ধুনট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও ধুনট উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার (ভারপ্রাপ্ত) রাজিয়া সুলতানা জানান, মুক্তিযোদ্ধা চলাকালীন সময়ে জালাল উদ্দিনের বয়স কম থাকার কারনে তার মুক্তিযোদ্ধা সনদ ও গেজেট বাতিল হয়েছে। একারনে তাকে আর কোন ভাতা দেওয়া হবে না। তবে তিনি ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সেজে এতদিন পর্যন্ত যে সরকারী ভাতা পেয়েছেন এজন্য তার বিরুদ্ধে কিভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবিষয়ে এখনও কোন নির্দেশনা আসেনি। তবে নির্দেশনা পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Facebook Comments (ফেসবুকের মাধ্যমে কমেন্ট করুন)

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
আপনার নাম লিখুন