Breaking News

বর্ণিল আয়োজনে নবান্ন উৎসব পালন করল বগুড়ার কলেজ থিয়েটার

bogra-2-15-11-2016

বগুড়া সংবাদ ডট কম (সিজুল ইসলাম, বগুড়া) : বাংলার হিরণ্য মৃত্তিকার সোনালি ধানে গোলা ভরে কৃষাণ কৃষাণি।কিষাণের বধূ উঠানে নতুন ধান গোলায় তোলার আনন্দে মুখরিত। চিত্রপটে বেজে ওঠে নবান্নের গান। শেফালি শিউলী আর বিটপীর ডগায় জমে থাকে শিশির বিন্দু। আনকোরা ধানে কলত্ররা নানান রকমের পিঠা, পায়েশ, ক্ষীর তৈরি করে খেজুর রস দিয়ে। প্রত্যেক বাড়ির আঙ্গিনায় জমে উঠে নবান্নের উৎসব, এ সবই গ্রামবাংলার অগ্রহায়নের চিত্র। অগ্রহায়ণ মানে নতুন ধানের মোদিরা গন্ধে আমোদিত দশদিক, অগ্রহায়ণ মানে নব অন্নে,নব আনন্দ।
প্রকৃতির এ আনন্দস্নানে “ক্ষুধা মেটে একই অন্নে, এসো মাতি সম্প্রীতির আনন্দে” এই স্লোগানে বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটারের অন্যতম শেকড় সন্ধানি নাট্য সংগঠন কলেজ থিয়েটার বগুড়া অগ্রহায়ণ এর প্রথম দিনে ৫ম বারের মত আয়োজন করল নবান্ন উৎসব। মঙ্গলবার সরকারি আজিজুল হক কলেজের মুক্তমঞ্চে চলে দিনব্যাপী কর্মযজ্ঞ। বর্ণাঢ্য কর্মসূচিতে ছিল আনন্দ পদযাত্রা, উদ্বোধনী অনুষ্ঠান,নবান্ন গীত, নব আনন্দে নব নৃত্য, নবান্ন কথন, আবৃত্তি, লোকজ গান, নাটক এবং ফিউশন বাউল পরিবেশনা।
ক্যাম্পাসের গাছগুলোকে বাহারি রঙ্গের কাপড়ে মুড়িয়ে কাপড়ের বিভিন্ন ফুল দিয়ে এমনভাবে সাজানো হয়েছে যেন রমণীরা হেমন্তকে আলিঙ্গন করবার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে।মঞ্চের সেট ডিজাইনেও ছিল ভিন্নতা। একপাশে দুজন গ্রাম্যবধূ কুলা দিয়ে নতুন ধানের চিতা পরিস্কার করছে প্রকৃতির হাওয়া কাজে লাগিয়ে আবার মাঝখানে গরুর গাড়ীতে করে কৃষক নতুন ধান কেটে নিয়ে আসছে আবার একদিকে খড়ের গাদা বাঁশের খুটিকে আঁকড়ে ধরে আছে। সেখানে একটি কাঠের গুড়িও আছে ধান মাড়াই করার জন্য। ঠিক যেন হেমন্তে গ্রামীণ কৃষকের ব্যস্ত উঠান।মঞ্চসজ্জা করেছেন সংগঠনের সহ সভাপতি শোভন চন্দ্র, সর্দার হামিদ, সুপিন বর্মন।
সকাল ৯:৩০ মিনিটে শুরু হয় আনন্দ পদযাত্রা। পদযাত্রাটি মুক্তমঞ্চ থেকে শুরু হয়ে পুরো ক্যাম্পাস প্রদক্ষিণ করে আবার মুক্তমঞ্চে ফিরে আসে। নাট্যকর্মীরা কাস্তে আর কুলা হাতে কৃষাণ-কৃষাণি, পলো হাতে মাঝি, একতারা হাতে বাউল, খেজুর রসের হাড়ি নিয়ে গাছিয়াল সেজে হাতে হাত রেখে সম্প্রীতির বন্ধনে মিলিত হয়ে একসাথে পথ চলে। আবার বাজনার তালে তালে লাঠিয়ালের লাঠি খেলার প্রদর্শনীতে মুখরিত করে তোলে কলেজ থিয়েটারের কর্মীরা। তাঁদের সাথে কলেজের শিক্ষক, কর্মচারী, ছাত্র-ছাত্রী সবাই যেন ক্লান্তি ভুলে আনন্দে মেতে ওঠে।
নবান্ন উৎসবে বাড়তি মাত্রা যোগ করেছে নাগরদোলা আর পিঠার দোকান।ভাপা পিঠা, পুলি পিঠা, দুধপুলি বাহারি পিঠা খেতে উপচে পড়া ভিড় চোখে পড়ার মত। শহুরে জীবনে খানিকটা গ্রামীণ মেলার আমেজ।
আনন্দ পদযাত্রার পর সকাল ১০টায় নবান্ন উৎসবের অনুষ্ঠান শুরু হয়। অনুষ্ঠান উপস্থাপনায়ও ছিল নাটকীয়তা। গ্রামের এক কৃষক বাড়িতে শহুরে বিয়াইনকে নাইর আনে নবান্ন উৎসবে।শহুরে বিয়াইন এই লোকজ সংস্কৃতির সাথে পরিচিত নয়। তাঁকে পাশ্চাত্য বিদেশি সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এনে বাংলা সংস্কৃতির সাথে পরিচয় করে দিতে বিয়াই আপ্রাণ চেষ্টা করে। নবান্নের গান, কবিতা, গীত, নৃত্য, বাউল গান, নাটক এবং নবান্ন কথনের মাধ্যমে বিয়াইন শেষমেষ বাংলা সংস্কৃতির নবান্ন উৎসবের শেকড় সম্পর্কে জানতে পারে এবং পাশ্চাত্য সংস্কৃতিকে বর্জন করে দেশীয় সংস্কৃতির লালন ও পালনের আহ্বান জানায়।
এরপর দুই হিন্দু মুসলমান কৃষক নতুন ধান কেটে নিয়ে আসে কিষাণিরা রীতি অনুযায়ী মঞ্চে প্রবেশের পূর্বে পায়ে পানি ঢেলে দেয়। নতুন আমন ধান কাটা আঁটি কাঠের গুড়িতে মাড়াই করার মধ্য দিয়ে নবান্ন উৎসব ১৪২৩ এর উদ্বোধন করেন সরকারি আজিজুল হক কলেজ বগুড়ার সম্মানিত অধ্যক্ষ প্রফেসর মোঃ সামস্-উল আলম। এসময় শুরু হয় উদ্বোধনী গান।গান শেষে “আমার মাইজা ভাই সাইজা ভাই কই গেলারে, চল যাই চল যাই ক্ষেতে ধান কাটিতে” নবান্নের এই গানের কথার সাথে নৃত্য পরিবেশন করেন নৃত্যছন্দম আর্টস একাডেমীর নৃত্য শিল্পী মেহেদী হাসান, ইহসানুল হক জিতু, রাকিবুল ইসলাম শান্ত, মুনতাসির মামুন, নিবেদিতা সাহা, জয়া সরকার নুসরাত জাহান রাহি, সংগীতা।
নবান্ন উৎসব উপলক্ষ্যে নবান্ন কথনের সভাপতিত্ব করেন কলেজ থিয়েটারের সভাপতি আমজাদ হোসেন শোভন। উদ্বোদক ও প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মোঃ সামস্-উল আলম। অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটারের সাধারন সম্পাদক তৌফিক হাসান ময়না, বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড.বেল্লাল হোসেন, ড.মীর ত্বাইফ মামুন মজিদ, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট বগুড়ার সহ-সভাপতি আতিকুর রহমান মিঠু, আছাদ হোসেন, সাধারণ সম্পাদক আবু সাইদ সিদ্দকী, এ কে আজাদ গ্রুপের এম ডি মাজেদুল ইসলাম রুমন, কলেজ থিয়েটারের সহ-সভাপতি সুপিন বর্মণ, সাধারন সম্পাদক তপন কুমার পাটোয়ারি। শুভেচ্চা বক্তব্য রাখেন নবান্ন উৎসব উদযাপন কমিটির আহবায়ক সবুজ চন্দ্র বর্মণ,সদস্য সচিব ওসমান গণি।
এরপর ড.সেলিম আল দীন রচিত তৌফিক হাসান ময়না নির্দেশিত “বাসন” নাটক মঞ্চায়িত করে বগুড়া থিয়েটার। নাটকের বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেন ফারুক হোসেন, সঞ্চিয়তা সরকার বিথী, বিধান রায়, অলক পাল, সাইফুল ইসলাম, মাহবুবে সোবহানি বাপ্পী, রেজোয়ান রাফি, রবিউল ইসলাম, হাসানুজ্জামান, মিঠু, আতিক রনি, ফিরোজ, আশিক প্রমুখ। আবহ সংগীতে ছিলেন ফিরোজুল ইসলাম।
নবান্ন উৎসবকে কেন্দ্র করে জারিগান, সারিগান, বাউলগানের আসর যেমন বসত তেমনি কৃষাণিরা কখনও কখনও পিঠা, পায়েশ,ক্ষীরসহ হরেক রকমের খাবার তৈরির সময় গীত গাইত মনের সুখে। সেই রীতির সাথে কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের মেলবন্ধন করে দিতে মঞ্চে গীত পরিবেশন করেন বিশিষ্ট লোকজ সংগীতশিল্পী ও লেখিকা সিকতা কাজল।
এরপর ওসমান গণি রচিত শোভন চন্দ্র সরকার নির্দেশিত “দাওয়াত” নাটক মঞ্চায়িত হয়। নাটকের বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন সিজুল ইসলাম, তন্ময় সূত্রধর, সাইফুল ইসলাম, সঞ্চয়িতা সরকার, রাখি খাতুন, তাসলিমা আকতার জুঁই, ফিরোজুল ইসলাম, রেজোয়ান রাফি, হাসানুজ্জামান, মুহাইমিনুল ইসলাম মাসুম, আতিকুর রহমান, ইমাম হাসান নিরব। আবহ সংগীত পরিবেশন করেন নির্মল মাহাতো, মিঠু দাস, রাশিয়ান চন্দ্র।
নাটকের পর নবান্নের কবিতা আবৃত্তি করেন কনক কুমার পাল অলক।
অতিথিদের গামছা এবং ফুল দিয়ে বরন করে নেয় নাট্যকর্মীরা। কবিতা আবৃত্তি করেন কনক কুমার পাল অলক। সবশেষে ফিউশন বাউল পরিবেশনের মধ্য দিয়ে নবান্ন উৎসব ১৪২৩ এর সমাপ্তি টানে কলেজ থিয়েটার। নান্দনিক ভাবে অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন নাট্যকর্মী সিজুল ইসলাম ও রুহি তাবাসসুম।