বগুড়া সংবাদ ডট কম (এইচ আলিম, বগুড়া) : বগুড়ায় তৈরী করা হচ্ছে ডিজিটাল ওজন স্কেল। কারখানায় তৈরী এই ডিজিটাল ওজন স্কেলের ব্যবহার বেড়েছে প্রায় সবখানে। ল্যাবরেটরী, স্বর্ণ ওজন, মুদি, শবজি, মাছ, মাংস, রড, সিমেন্ট, পুরাতন জিনিস ক্রয় বিক্রয়ের দোকান থেকে শুরু করে বড়বড় যানবাহন ওজন করার জন্যও এই ডিজিটাল ওজন স্কেল ব্যবহার হচ্ছে। বাটখারার ঝামেলা ও সময় বাঁচাতে ক্ষুদ্র থেকে উচ্চ পর্যায়ের ব্যবসায়িরা এই ওজন স্কেল ব্যবহার করছে। বগুড়ার শোভা এ্যাডভান্সড টেকনোলজিস লিমিটেড এর কারখানায় প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪০টি সুমো ডিজিটাল ওজন স্কেল তৈরী হচ্ছে। তৈরী কারকরা বলছেন পণ্য পরিমাপের ওজন স্কেল তৈরীতে আরো অর্থ বিনিয়োগ করতে পারলে এবং সরকারি সহযোগিতা পেলে বিদেশে রপ্তানী করে দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে এ প্রতিষ্ঠানটি।
বগুড়া শহরের ফতেহ আলী, মালতিনগর, চাষিবাজার, রাজা বাজারে বাটখারা বা দাঁড়িপাল্লার পরিবর্তে ডিজিটাল স্কেল দিয়ে ওজন করে মাছ বিক্রি করছেন ব্যবসায়িরা। একই রকমভাবে মুড়ির দোকানে, সবজির দোকানে, মুদির দোকানেও ওজন করার জন্য শোভা পাচ্ছে ডিজিটাল ওজন স্কেল।
খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, বগুড়া শহরের বড়গোলা, টিনপট্টিতে রড ও টিনশিড ওজন করা হচ্ছে ডিজিটাল ওজন স্কেল দিয়ে। সেখানে বাটখারা বা দাঁড়িপাল্লার ওজন নেই। বেশিরভাগ রড সিমেন্টর দোকানে ডিজিটাল ওজন মেশিন। একই রকম দেখা গেছে, বগুড়া শহরের মিষ্টির দোকাসে, বেকারীর দোকানে, হোটেল রেস্টুরেন্টে, ফলের দোকান, মুরগী বাজারে, সবজির দোকানে শহরের বিভিন্ন ধরনের ব্যবসায়িরা এই ডিজিটাল ওজন স্কেল ব্যবহার করছে। ডিজিটাল স্কেলের মধ্যে প্রায় ৯৫ ভাগই বগুড়ার শোভা এ্যাডভান্সড টেকনোলজিস লিমিটেড এর কারখানায় তৈরী করা।
বগুড়া শহরের মালতীনগর বাজারের মুরগী ব্যবসায়ি শফিকুল ইসলাম, সবজি বিক্রেতা আব্দুর রহিম, মুদি দোকান বিমল কবিরাজ জানান, দাঁড়িপাল্লা দিয়ে ওজন করার সময় নানা ঝামেলা। ওজন পাথর তোলা, দাঁড়িপাল্লা হাতে ধরে রাখা অনেক কষ্টসাধ্য বিষয়। একই হাতে বারবার ওজন করার ক্ষেত্রে হাতে ব্যথা হয় মাঝে মাঝে। কিন্তু এখন ওজন মেশিন থাকায় ঝামেলা হয় না। ক্রেতারাও কম বা বেশি নিয়ে কোন কথা বলতে পারছে না।

বগুড়া শহরের টিনপট্টি এলাকার রড ব্যবসায়ি মাহমুদ হোসেন জানান, শুরুতে রড বিক্রি হতো ওজন করা পাথর দিয়ে। তারপর ওয়েট স্কেল দিয়ে। এখন ডিজিটাল স্কেল দিয়ে মাপা হয়। ওজন স্কেলটি বগুড়ায় তৈরী হয় বলে জানিয়ে তিনি বলেন, ওজন স্কেলটি ব্যবহারের বিভিন্ন নিয়ম কোম্পানী থেকে বুঝিয়ে দিচ্ছেন। কোন সমস্যা হলে মোবাইল ফোনে কল করলেই তাদের লোকজন চলে আসে।
বগুড়া শহরের ফতেহ আলী বাজারের ব্যাবসায়িরা জানান, ওজন স্কেল দিযে জায়গা কম লাগছে। খাঁটুনিও কম। ওজনের কম বেশি হয় না। যত গ্রাম ওজন হবে তত গ্রামের দামও ক্রেতা দিয়ে থাকে। সে ক্ষেত্রে কোন পণ্য কাটা ছেঁড়া করতে হয় না।
বগুড়ার শোভা এ্যাডভান্সড টেকনোলজিস লিমিটেড এর কারখানায় গিয়ে দেখা যায়, বেশ কিছু নারী শ্রমিক, পুরুষ শ্রমিক কাজ করছে। তাদের সাথে বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি কলেজ থেকে পাশ করা প্রকৌশলীরা ওজন স্কেলটি তৈরী করছে। কারখানায় প্রকৌশলীরা বিভিন্ন কিছুু দিয়ে তৈরী করছে সুমো ডিজিটাল স্কেল। শ্রমিকরা স্কেলের রং করছেন আবার কেউ বা বক্স তৈরী করছেন, কেউ করছে স্টিল শেডের কাটিং আবার তৈরীর পর তা নীরক্ষণ করছে।
শোভা এ্যাডভান্সড টেকনোলজিস লিমিটেড কারখানার চীপফ প্রকৌশলী শাহীন হোসাইন জানান, প্রকৌশলী রয়েছে ১৯ জন। আর সারা দেশে প্রকৌশলী রয়েছে মোট ৯৬ জন। শ্রমিক প্রয়োজনমত কম বেশি হয়ে থাকে। তবে স্থায়ীভাবে রয়েছে অর্ধশত। আর দেশে শ্রমিক রয়েছে প্রায় ২০০ জন। ৪৮৫টি উপাদান দিয়ে একটি ওজন স্কেল তৈরী হয়ে থাকে। এরমধ্যে লোডসেল ভারত বা চীনের ব্যবহার করা হয়। সার্কিট ও তার বিশেষ সফটওয়্যার সহ আইসি নিজেদের তৈরী করা। এছাড়া এর লোহা জাতীয় সব ব্যববার হয়ে থাকে দেশীয়ভাবে। মাননিয়ন্ত্রণে বিএসটিআই পরীক্ষিত। অনুমোদন সাপেক্ষে কারখানায় কাজ চলছে। প্রতিদিন গড়ে ৪০টি ওজন স্কেল তৈরী করা যায়। তিনি যেদিন যানবাহন ওজন করার জন্য ওজন স্কেল তৈরী করা হয়ে থাকে সেদিন স্কেল কম তৈরী হয়ে থাকে। প্রয়োজন অনুসারে সব কিছু ওজন করার জন্য তারা ওজন স্কেল তৈরী করে থাকে। ল্যাবরেটরী থেকে স্বর্ন, মুদি এমনকি বড়বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রয়োজনীয় ওজন স্কেল তৈরী করে থাকেন।
১৯৯৯ সালে মেসার্স শোভা এন্টারপ্রাইজ নামে কাজ শুরু হয়। এরপর প্রতিষ্ঠানটি কার্টুন, প্রিন্টিং, এ্যাডহোসিভ টেপ, বান্ডিং টেপ, ব্যাটারীসহ বেশ কয়েকটি পণ্য তৈরী করে বাজারজাত করতো। ২০০৯ সালে এসে মেসার্স শোভা এন্টারপ্রাইজ এর অঙ্গ প্রতিষ্ঠান হিসেবে শোভা এ্যাডভান্সড টেকনোলজিস লিমিটেড এর কাজ শুরু হয় বগুড়া শহরের স্টাফ কোয়ার্টার লেনের মালতীনগরে। এই কারখানা থেকে সুমো ডিজিটাল পণ্য পরিমাপক তৈরী করা হচ্ছে। সুমো ডিজিটাল ওজন স্কেলটি বগুড়া, জয়পুরহাট, রংপুর, গাইবান্ধা, রাজশাহী, নাটোর, ঢাকা, টাঙ্গাইলসহ দেশের প্রায় জেলায় বিক্রি করা হচ্ছে। প্রতিটি জেলায় রয়েছে বিক্রয় প্রতিনিধি ও প্রকৌশলী। রয়েছে ক্রেতা পর্যায়ে সুবিধা প্রদানে কল সেন্টার ও সেবা দেয়ার জন্য জনবল।
বগুড়ার সুমো ডিজিটাল ওজন স্কেল তৈরীর প্রতিষ্ঠান শোভা এ্যাডভান্সড টেকনোলজিস লিমিটেড এর সি.ই.ও সৈয়দ আহম্মেদ কিরন জানান, ২০১৩ সালে সিআইপি হয়েছিলাম। কারখানায় সব মিলিয়ে প্রায় ৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে। বছরে ৫০ কোটি টাকার পণ্য বিক্রি হয়ে থাকে বলে দাবী করেন। এখন কারখানায় তার প্রতি মাসে ৩ থেকে সাড়ে ৩ কোটি টাকার পণ্য উৎপাদন এবং সম পরিমান বিক্রি হয়ে থাকে। কারখানাটি প্রতি মাসে ১০ কোটি টাকার পণ্য উৎপাদন ধারণ ক্ষমতা রয়েছে। দেশে সুমো ডিজিটাল ওজন স্কেল বিক্রি হচ্ছে এজন্য কাজ করছে ৯৬ জন ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার। বিএসটিআই এর সার্বিক সহযোগিতায় প্রতিটি মেশিন ক্যালিব্রেশন করে তারপর বাজারজাত করা হয়।
সৈয়দ আহম্মেদ কিরন জানান, তিনি একদিন বাজার থেকে ৫০ কেজি পেঁয়াজ কেনেন। তারপর সেটি ওজন করে ৪৮ কেজি পেঁয়াজ পান। দাঁড়িপাল্লায় ওজন করার পরেও পেঁয়াজ কম পাওয়ার কারণে তার কষ্ট দেখা দেয়। পরে তিনি একটি সুরক্ষিত ওজন স্কেল তৈরীর কথা ভাবেন। এরপরই তিনি এই ওজন স্কেলটি তৈরীর প্রতি মনযোগি হন এবং সেটি ব্রান্ডে পরিনত হয়। দেশের যে কোন প্রান্তে সাধারণ ব্যবসায়িদের ঝামেলা মুক্ত বেচাকেনার চিন্তা থেকে সুমো ডিজিটাল স্কেল তৈরীতে অগ্রসর হয়েছেন। তিনি জানান, সরকারি সহযোগিতা পেলে এবং বিনিয়োগ বাড়ানোর নিশ্চয়তা পেলে সুমো ডিজিটাল স্কেল বিদেশে রপ্তানী করা সম্ভব হবে।

Facebook Comments (ফেসবুকের মাধ্যমে কমেন্ট করুন)

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
আপনার নাম লিখুন