সন্ধ্যে নামার পর থেকেই সুপ্রভার মন খারাপ।অবশ্য এটাকে মনখারাপও বলা যায়না।অদ্ভুত এক অনুভূতি! যেন অপার্থিব কোনো অনুভূতি।যে অনুভূতিকে শব্দবন্দী করার ক্ষমতা নেই সুপ্রভার।মাঝে মাঝেই ওর এরকম হয়।ওর ধারনা, একমাত্র পাগলরাই এরকম অনুভূতির মধ্য দিয়ে সময় পার করে।এরকম সময়ে কেউ ওর পিঠে জোরে জোরে কিল দিলে ওর ভালো লাগে।এখন কেউ নেই পাশে।ওর বড় বোন সায়মা বেড়াতে গেছে কক্সবাজার।ভার্সিটির বন্ধুদের সাথে।সুপ্রভারও ইচ্ছে করে সমুদ্র দেখতে, কিন্তু সমুদ্র নিয়ে ওর অন্যরকম বাসনা আছে।ও প্রথম সমুদ্রে পা ভেজানোর মাহেন্দ্রক্ষণে ওর পাশে থাকবে ওর ভালোবাসার মানুষটি।সুপ্রভা কি কাউকে ভালোবাসে?হয়তো বা বাসে।তবে সে কথা ও কাউকে বলবেনা কোনোদিন না।মরে গেলেও না।

সুপ্রভা ফোন করলো ওর বন্ধু শুভকে।শুভকে ফোন করে এই অনুভূতির কথা বললো।শুভ কোথায় সান্ত্বনা দেবে,উল্টো বললো,”তুমি প্লীজ ডাক্তার দেখিওনা।ডাক্তার দেখালে যদি ভালো হয়ে যাও,এরকম অপার্থিব অনুভূতি ভীষণ মিস করবে।জীবন হবে ডিমের সাদার মতো পানসে।কিছুটা অপার্থিবতা থাকা ভালো। “সুপ্রভার মশাদের প্যাঁন প্যাঁনের মতোই অসহ্য লাগছিলো শুভর কথা। মাঝে মধ্যেই এরকম ফালতু বকা ওর স্বভাব।এজন্য সুপ্রভা ওকে মশা নামে ডাকে।এই শুভ ছেলেটার জীবনটা অদ্ভুত রকম। তার কথা বলা যাবে পরে, কোনো একদিন!

সুপ্রভা ফোন কেটে দিলো, প্রচন্ড কান্না পাচ্ছে।হৃৎপিণ্ড যেনো অবশ হয়ে আছে। সুপ্রভা মুখে রুমাল গুঁজে দুই চোখের নীচে দুই হোমিওপ্যাথি ঔষধের খালি শিশি ধরলো। এটা হলো সুপ্রভার অশ্রুজল মাপা ও জমা রাখার পদ্ধতি।১২বছর বয়স থেকে আজ পর্যন্ত ওর সব কান্না শিশি বন্দী জমা আছে আলমারীতে,সযতনে,গোপনে।এই আলমারীতে কারো হাত দেওয়া নিষেধ।সুপ্রভা মেয়েদের মতো কথায় কথায় কাঁদেনা। মাঝে মাঝে কাঁদে। একবার সর্বোচ্চ ১৩ শিশি কেঁদেছিলো,যখন হুমায়ুন ভাই তাকে গাঁধী বলেছিলো।সে তাদের বাগানের এককোনে বসে সত্যিকারের গাঁধীর মতো ঘাস ছিঁড়ে ছিঁড়ে খেয়েছিলো আর কেঁদেছিলো।ভিডিও ক্যামেরায় দৃশ্যটা ধারন করে ইউটিউবে আপলোড করলে, প্রচন্ড হাস্যকর ভিডিও হিসেবে ভাইরাল হয়ে যেতো। সুপ্রভা মুখ ভর্তি ঘাস চিবোচ্ছিলো আর দুই চোখের নীচে দুইটা শিশিতে কান্না ভরছিলো।অবশ্য সুপ্রভার কাছে মোটেও হাস্যকর ছিলোনা।প্রচন্ড কষ্টের,প্রচন্ড!তবে কি সুপ্রভা ভালোবাসে হুমায়ুন ভাই ওরফে হুমায়ুন আহমেদকে?ওই কান্না ছিলো অভিমান মিশ্রিত ভালোবাসার অশ্রুজল?কতো শিশি কেঁদে ফেললে তাকে পাওয়া যাবে?

সুপ্রভার আরো একদিন ছিলো খুব কান্না পাবার দিন।ওদিন সে কাঁদেনি এক ফোঁটাও। বরং হেসেছিলও প্রচন্ড।তবে সবার চোখের সামনে নয়।গোপনে,ষ্টোররুমে। কারন মৃতবাড়িতে হাসা বারন।সেদিন ওর খুব প্রিয় কবির মামা মারা গিয়েছিলেন হার্ট অ্যাটাকে।সুপ্রভাকে যদি বলা হয়, পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো মানুষ কে? সে অবশ্যই বলবে,কবির মামা।সুপ্রভাকে অনেক মজার মজার গল্প শোনাতেন কবির মামা।কি মধুর সব ফেলে আসা মামা ভাগনীর দিনগুলো!সেদিন বাড়ীর সবাই খুব কাঁদছিলো কিন্তু সুপ্রভার বারবার কবির মামার বলা বিড়াল নিয়ে বলা জোকস টা মনে পড়ছিলো আর প্রচন্ড হাসি পাচ্ছিলো।কি অদ্ভুত মানুষের অনুভুতি!তার চেয়ে অদ্ভুত প্রশ্ন,যে মানুষটা সবসময় অন্যকে হাসাতেন,নিজেও হাসতেন।তিনি কেনো মারা যাবেন হার্ট অ্যাটাকে? হাসলে নাকি হার্ট ভালো থাকে!

সুপ্রভা আজ দেড় শিশি কেঁদেছে।এখন কিছুটা সুস্থবোধ করছে।সুপ্রভার পোষা বিড়ালটা ওর অসম্ভব সুন্দর পায়ের কাছে গা ঘষা দিচ্ছে আদর পাবার জন্য।সুপ্রভার পা এতো সুন্দর কেনো? সুপ্রভা বিড়ালটাকে কোলে তুলে মাথায় আদর করতে করতে চুমো খেতে লাগলো।
সবার পোষা বিড়ালের কোন না কোন নাম থাকে,সুপ্রভার বিড়ালের নেই।এটা শুধুই সুপ্রভার বিড়াল।একটাই পরিচয় তার,সে সুপ্রভার বিড়াল।একান্ত সুপ্রভার।

(চলবে…)

© মশিউর শুভ

Facebook Comments (ফেসবুকের মাধ্যমে কমেন্ট করুন)

2 মন্তব্য সমূহ

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
আপনার নাম লিখুন