বগুড়া সংবাদ ডট কম (নন্দীগ্রাম প্রতিনিধি মো: ফিরোজ কামাল ফারুক) : বগুড়ার নন্দীগ্রাম উপজেলা মহিলা বিষয়ক অফিসের আয়োজনে জয়িতা অন্বেষণে বাংলাদেশ শীর্ষক কার্যক্রমের আওতায় ৫ ক্যাটাগরীতে ৫ সংগ্রামী সফল নারী নির্বাচিত হয়েছেন। তারা এখন সমাজের নিপীড়িত নির্যাতিত ও অবহেলিত নারীদের কাজ করছেন। নন্দীগ্রাম মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার কার্যালয় ও উপজেলা প্রশাসনের সহযোগীতায় নারী নির্যাতন প্রতিরোধ পক্ষ এবং বেগম রোকেয়া দিবস-২০১৭ উদযাপন উপলক্ষে জয়িতা অন্মেষণে বাংলাদেশ কার্যক্রমের যাচাই-বাছাই শেষে ৫ জন নারীকে উপজেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ জয়িতা নির্বাচিত করা হয়।
এরা হলেন- সফল জননী নারী পৌর শহরের নামুইট গ্রামের মৃত কিষ্ণ চন্দ্রের স্ত্রী সরস্বতী দাস। তিনি একজন সহায় সম্বলহীন বিধবা নারী। স্বামীকে হারিয়ে তিন সন্তানকে নিয়ে দিন মজুর ও নকশিকাঁথা সেলাই করে ছেলে-মেয়েদের উচ্চ শিক্ষার পথে অগ্রসর করেছেন। সে তিনটি সন্তানকে সুনিশ্চিত অনাবিল অবিষ্যৎ সৃষ্ঠির লক্ষে যে শ্রম, মেধা এবং ধৈর্য্যের পরিচয় দিয়েছেন তা সত্যিই গ্রামীন দরিদ্র পরিবারের বিধবা নারীর জীবনে এক অবিস্বরনীয় ঘটনা। তার বড় সন্তান বিএসসি পাশ করে স্কায়র ঔষধ কোম্পানীতে চাকুরী করছেন। দ্বিতীয় ছেলে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় হতে এমএজি শেষ করে রংপুর কাজী এন্ড কাজী র্ফামে রয়েছেন। ছোট মেয়ে কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজে এমবিএসএস শেষ বর্ষের ছাত্রী। সন্তানদেরকে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে পেরে আজ তিনি সফল মা সমাজে অন্যদের অনুকরনীয়।
শিক্ষা ও চাকুরী ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনকারী নারী উপজেলার হাটুয়া গ্রামের সুকমল চন্দ্রের স্ত্রী শ্রীমতি তমা রানী। সে গরীব ঘরের মেয়ে। তার মা কখনো চাইতেন না সে লেখাপড়া করুক। তবুও সে নিজের ইচ্ছায় পড়াশুনা করেছেন। পাইভেট পড়িয়ে তার পড়াশুনার খরচ চালাতো। এসএসসি পাশ করার পর তার বিয়ে হয়। বিয়ের পর শ্বশুর বাড়ীর লোকজন, স্বামী তার পড়াশুনা বন্ধ করতে বলে। কিন্তু তমারানী থেমে থাকেনি। সে পড়াশুনা চালিয়ে যায় এবং পাশাপশি কেজি স্কুলের শিক্ষিকা হিসেবে চাকুরী শুরু করে। এরমাঝে তার একটি কন্যা সন্তান হয়, এতো ঝামেলার মাঝেও সে ভালভাবে এইচএসসি পাশ করে। এরপরে সে অর্নাসে ভর্তি হয়। বর্তমানে সে ৪র্থ বর্ষের ছাত্রী। অনেক বাধা বিঘ্ন কাটিয়ে তমারানী পড়াশুনা চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি শিক্ষকতা করছেন। তার এই অদম্যতার জন্য তাকে চাকুরী ও শিক্ষা ক্ষেত্রে সফল হয়েছেন যে নারী ক্যাটাগরীতে মনোনীত করা হয়।
সমাজ উন্নয়নে অসামান্য অবদান রেখেছেন: উপজেলার হাটলাল গ্রামের মোফা প্রামানিকের স্ত্রী মেরিনা বেগম। মেরিনা বেগম একজন সহজ সরল গ্রাম্য মহিলা। গ্রামে যার যখন কোন বিপদ হয় তার পাশে দাঁড়ান এবং সাধ্যমত সহযোগীতা করেন। এই সহযোগীতা সহমর্মিতার কারণে গ্রামবাসী তাকে মহিলা সদস্য হিসেবে নির্বাচিত করেছেন। এই অসামান্য অবদানের জন্যই সমাজ উন্নয়নে অসামান্য অবদান রেখেছেন যে, নারী ক্যাটাগরিতে জয়িতা হিসেবে তিনি নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি সমাজের অবহেলিত নারীদের জন্য নিবেদিত প্রাণ।
অর্থনৈতিক ভাবে সাফল্য অর্জনকারী নারী উপজেলার কহুলী গ্রামের বাচ্চু মিয়ার স্ত্রী জাকিয়া বিবি। সে একজন গৃহিনী। তার সংসারে অভাব অনটনের শেষ নাই। সংসার জীবনে তার ৩টি সন্তান। সন্তানদের পড়ালেখা করানো অনেক কষ্টের। তিনি যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর, জাতীয় মহিলা সংস্থা থেকে প্রশিক্ষন গ্রহন করেন। উপজেলা পরিষদ হতে সেলাই মেশিন পান। তিনি নিজে সেলাই এর অর্ডারী কাজ করেন এবং মেয়েদেরকে ব্যাচ করে প্রশিক্ষন প্রদান করেন। বর্তমানে মাসে প্রায় ১০ হাজার টাকা আয় করেন। এখন তার সংসারে সচ্ছলতা ফিরে এসছে। সামাজিক প্রতিকুলতা উপেক্ষা করে তিনি স্বাবলম্বী হয়েছেন। জাকিয়া বিবি অর্থনৈতিক ভাবে সাফল্য অর্জনকারী, উৎসাহ ও উদ্দীপনা সৃষ্টিকারী এবং জীবন যাত্রার মান উন্নয়নে সচেতন নারী হিসেবে সমাজে পরিচিত। এজন্যই তাকে অর্থনৈতিক ভাবে সাফল্য অর্জনকারী নারী ক্যাটাগরীতে জয়িতা নির্বাচিত করা হয়েছে।
নির্যাতনের বিভাষিকা মুছে নতুন উদ্যামে জীবন শুরু করেছেন উপজেলার দামুয়াপাড়া গ্রামের সুকেন্দ্র নাথের স্ত্রী শিউলী রানী মহন্ত। তিনি বিয়ের পর থেকেই শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন শিকার। স্বামী বখাটে প্রকৃতির। প্রায়ই তাকে মারধর করতো যৌতুকের টাকার জন্য। ফলশ্রুতিতে তার বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে। সনতন ধর্মের অনুসারী হওয়ায় সামাজিক ভাবে হেয় প্রতিপক্ষের শিকার হন। কিন্তু তিনি অনেক বাধা বিপত্তি অতিক্রম করে দুঃখ-কষ্ট নির্যাতনের কথা ভুলে গিয়ে নতুন উদ্যোমে জীবন শুরু করেছেন। তার প্রকিব›দ্ধী সন্তানের দেখাশুনা করা, বাবা-মা’র আহার যোগার করার জন্য সংগ্রাম করেছেন। এখন সমাজের অন্যান্য নারীরা শিউলী রানীর পরামর্শ গ্রহন করেন। এভাবে তিনি নতুন জীবন শুরিু করেন। তাই শিউলী রানীকে নির্যাতনের বিভীষিকা মুছে ফেলে নতুন উদ্যোমে জীবন শুরু করেছেন যে নারী ক্যাটাগরীতে মনোনীত করা হয়েছে। সমাজের অন্য নারীরাও তাকে শ্রদ্ধা করে। এই পাঁচজন সফল নারী সমাজে অন্যদের অনুকরণীয় হয়ে উঠেছেন।
এবিষয়ে উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা ও কমিটির সদস্য সচিব খালেদা ইয়াসমিন জানান, ইউনিয়ন পর্যায়ে হতে আগত আবেদন পত্র যাচাই-বাছাই শেষে উপজেলা পর্যায়ে ৫ জন জয়ীতাকে নির্বাচন করা হয়। তিনি আশা করেন উপজেলার পর্যায়ে নির্বাচিত ৫ জন জয়ীতা আগামী দিনে সমাজ উন্নয়নে আরো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন।

Facebook Comments (ফেসবুকের মাধ্যমে কমেন্ট করুন)

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
আপনার নাম লিখুন