বগুড়া সংবাদ ডট কম (ধুনট প্রতিনিধি ইমরান হোসেন ইমন) : সময়টা মঙ্গলবার বিকাল সাড়ে ৫টা। হঠাৎ চোখে পড়ল বগুড়ার ধুনট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স চত্তরে কিছু মানুষের জটলা। সামান্য এগিয়ে গিয়েই দেখা মিলল এক গর্ভবতী নারীকে ঘিরে নিয়ে বসে আছেন তার কয়েক স্বজন। তবে ওই নারীর শারীরিক অবস্থা তেমন ভাল ছিল না। যেন সন্তান প্রসবের ব্যাথা নিয়েই মৃতু ষন্ত্রনায় ছটফট করছিল। তার মৃত্যু যন্ত্রনা দেখে তাদের স্বজনেরা চিৎকার করে করে কাঁদছিলেন। কিন্তু তাতেও কারো কোন সাড়া শব্দ নেই। তাই ওই নারীর স্বজনেরা সরকারী হাসপাতাল চত্তরেই কম্বল দিয়ে ঘিরে নিয়ে তার সন্তান প্রসবের চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু সরকারী হাসপাতাল থাকলেও এক নারীকে খোলা জায়গায় সন্তান প্রসবের চেষ্টা চলছিল। তাই এ দৃশ্য স্থানীয় এক সাংবাদিক ছবি তুলতে গেলেই শুরু হয় দালালদের দৌড়ঝাপ। তারা তারাহুরা করে হাসপাতাল চত্তর থেকে ওই নারীকে একটি গাড়ীতে করে বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠায়। তবে চিকিৎসা বঞ্চিত ওই নারীর নাম সোনিয়া আকতার (১৯)। সে কালেরপাড়া ইউনিয়নের মাদারভিটা গ্রামের মিন্টু মিয়ার স্ত্রী।
জানাগেছে, মঙ্গলবার বিকাল ৪টায় প্রসব ব্যাথা নিয়ে সোনিয়া আকতার ধুনট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আসে। কিন্তু কোন পরীক্ষা নিরীক্ষা ছাড়াই হাসপাতালের দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক তাকে রেফার্ড করলেন বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। তাই হতাশাগ্রস্থ হয়ে ওই নারীর স্বজনেরা হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে এলো। আর বাহিরে এসেই পড়ে গেলো দালালদের খপ্পরে। দালালরা রোগীকে নিয়ে টানাহেচড়া করে হাসপাতালের সামনের একটি ডায়াগনষ্টিক সেন্টার এন্ড ক্লিনিকে নিয়ে যায়। কিন্তু সেখানে দেড় ঘন্টা সময় ব্যয় করার পর খিচুনী ওঠায় তারা রোগীকে বের করে দেয় তাদের ডায়াগনষ্টিক সেন্টার এন্ড ক্লিনিক থেকে। তাই নিরুপায় হয়ে রোগীর স্বজনেরা তাকে হাসপাতাল চত্তরেই সন্তান প্রসবের চেষ্টা করছিল। তবে ওই নারীর এক স্বজন জানান, রোগীকে বগুড়ায় নেওয়ার পর সোনিয়া ও তা সন্তান দুজনই এখন সুস্থ রয়েছেন। শুধু সোনিয়া আকতারই নয় তার মতো অনেক নারীকেই সন্তান প্রসব করতে এসে ধুনট হাসপাতাল থেকে ফিরে যেতে হয়েছে। এছাড়া অনেক নারীকে চিকিৎসা বঞ্চিত হয়ে জীবনও দিতে হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানাগেছে, ধুনট উপজেলার সাড়ে ৩ লাখ জনগোষ্টির জন্য ৫০ শয্যা বিশিষ্ট একমাত্র সরকারী এই হাসপাতালে ১৯ জন ডাক্তারের স্থলে মাত্র ৬ জন ডাক্তার কর্মরত আছেন। তন্মধ্যে সম্প্রতি এক ডাক্তারের বদলী হয়েছে। এছাড়া ২৫জন নার্সের স্থলে রয়েছে ১৭জন। এদিকে এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২টি অপারেশন থিয়েটার রয়েছে। কিন্তু ডাক্তার ও জনবলের অভাবে দীর্ঘদিন যাবত অপারেশন থিয়েটার বন্ধ রয়েছে। এতে সরকারের কোটি কোটি টাকার যত্রপাতিগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এসিগুলো অনেক আগেই নষ্ট হয়ে গেছে। এছাড়া ২০০৪ সালে ৮ লাখ টাকায় ক্রয়কৃত এক্সরে মেশিনটি একদিনের জন্যও চালু করতে পারেনি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। তাছাড়া ইসিজি মেশিন ও আলট্রাসনোগ্রাফি মেশিন থাকলেও জনবলের অভাবে মেশিনগুলো দীর্ঘদিন যাবত বিকল হয়ে রয়েছে। ফলে কোন জরুরী রোগীকে এখানে ভর্তি করানো হয় না। জরুরী রোগী আসলেই তাকে রেফার্ড করে বগুড়ায় পাঠানো হয়। এছাড়া ২টি এ্যাম্বুলেন্সের মধ্যে ১টি বিকল হয়েই গ্যারেজেই পড়ে রয়েছে। তবে ধুনট উপজেলার একমাত্র সরকারী এই হাসপাতালে সাধারন রোগীরা স্বাস্থ্য সেবা থেকে বঞ্চিত হলেও কর্তৃপক্ষের কোন নজরদারি নেই। তাই এই সুযোগে দৌড়াত্ব বেড়েছে ক্লিনিকের দালালদের। এছাড়া হাসপাতাল চত্তরে বিভিন্ন ঔষধ কোম্পানীর রিপ্রেজেনটেটিভদের আনা গোনা তো রয়েছেই।
ধুনট উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আলহাজ্ব একেএম তৌহিদুল আলম মামুন বলেন, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দীর্ঘদিন যাবত ডাক্তার ও প্রয়োজনী যন্ত্রপাতি বিকল হওয়ায় সাধারন রোগীদের ভোগান্তির যেন শেষ নেই। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে মাসিক সমন্নয় কমিটির সভায় বারবার এটা নিয়ে আলোচনা করেছি এবং উর্দ্ধতন কর্মকর্তাদের বিষয়টি অবগত করেছি।
তবে এবিষয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যান কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম বলেন, হাসপাতালে ১৯জন ডাক্তারের পদ থাকলেও মাত্র ৬জন ডাক্তার দিয়ে চিকিৎসা সেবা দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া জনবলের অভাবে যন্ত্রপাতিগুলোর ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না।

Facebook Comments (ফেসবুকের মাধ্যমে কমেন্ট করুন)

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
আপনার নাম লিখুন