বগুড়া সংবাদ ডট কম : ০৭/১২/২০১৭ খ্রিঃ রাত অনুমান ০১.০০ ঘটিকায় গোপন তথ্যের ভিত্তিতে জনাব মোঃ আসাদুজ্জামান বিপিএম, পুলিশ সুপার(অতিঃ ডিআইজি পদে পদোন্নতি প্রাপ্ত), বগুড়ার দিক-নিদের্শনায় পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের ইন্টেলিজেন্স শাখা ও বগুড়া জেলা পুলিশের যৌথ অভিযানে বগুড়া শিবগঞ্জ থানাধীন ঢাকা-রংপুর মহাসড়কের মোকামতলা বাজারের অনুমান ২০০ গজ উত্তরে জয়পুরহাট রোডের মোড় হতে নব্য জেএমবির নিম্নবর্ণিত শীর্ষস্থানীয় জঙ্গি সদস্যদের একটি ৯ এমএম বিদেশী পিস্তল, একটি ম্যাগাজিন, ০৫ রাউন্ড ৯ এমএম বিদেশী পিস্তলের তাজা গুলি, ৭.৬৫ পিস্তলের ১০ রাউন্ড তাজা গুলি, ০৪ টি অত্যাধুনিক বার্মিজ চাকু ও ০১ টি চাপাতিসহ গ্রেফতার করা হয়।

গ্রেফতারকৃতরা হলো ঃ

(১) নব্য জেএমবির উত্তরবঙ্গের ১৬ টি জেলার সামরিক প্রধান ও শুরা সদস্য মোঃ বাবুল আক্তার @ বাবুল মাষ্টার @ মাস্টার(৪৫), পিতা-মৃত শফিকুল ইসলাম @ শফু দর্জি, সাং-কসবা সাগরপুর জালেপাড়া, থানা-বিরামপুর, জেলা-দিনাজপুর।
(২) নব্য জেএমবির শুরা সদস্য বগুড়া শেরপুর থানাধীন গাড়িদহ জোয়ানপুর জঙ্গি আস্তানার অন্যতম প্রধান আসামী এবং ঐ জঙ্গি আস্তানা হতে অস্ত্র ও গোলাবারুদ সহ পালিয়ে যাওয়া মোঃ দেলোয়ার হোসেন @ মিস্ত্রি @ মিজানুর রহমান(৩৯), পিতা-মৃত লোকমান আলী, সাং-পারইল আছির হাজীপাড়া, থানা-মান্দা, জেলা-নওগাঁ।
(৩) নব্য জেএমরিব সক্রিয় সদস্য মোঃ আলমগীর হোসেন @ আরিফ(২৮), পিতা-মৃত আব্দুল করিম, সাং-তলোইগাছা, থানা ও জেলা-সাতক্ষিরা। ২০১৬ সালে মাঝামাঝি সময়ে শীর্ষস্থানীয় জঙ্গি নেতা সাগরের মাধ্যমে হিজরত করে।
(৪) নব্য জেএমরিব সক্রিয় সদস্য মোঃ আফজাল হোসেন @ লিমন (৩২), পিতা-আহম্মদ আলী, সাং-আড়াল, থানা-কাপাসিয়া, জেলা-গাজীপুর। ২০১৬ সালের প্রথম দিকে গাইবান্ধা জেলার গোবিন্ধগঞ্জের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বিক্রি করে শীর্ষস্থানীয় জঙ্গি নেতা রাজীব গান্ধীর মাধ্যমে হিজরত করে।

বাবুল মাস্টারের জঙ্গি জীবন ঃ

* ২০০৩ সালে জেএমবিতে যোগদান এবং ২০১৩ সাল পর্যন্ত জেএমবিতে অবস্থান করে উত্তরাঞ্চলে দাওয়াতি কার্যক্রম পরিচালনা করে।
* ২০১৪ সালে নব্য জেএমবিতে যোগদান।
* সাংগঠনিক কাজে অত্যন্ত দক্ষ হওয়ায় ২০১৭ সালের প্রথম দিকে উত্তরবঙ্গের সামরিক প্রধান হিসেবে দায়িত্ব লাভ করে।
* ২০১৭ সালে মে মাসে নব্য জেএমবির শুরা সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পায় ।
* ২০১৫ সালের ১০ নভেম্বর রংপুর জেলার কাউনিয়া থানাধীন খাদেম রহমত আলী হত্যা মামলার অন্যতম চার্জসীটভুক্ত আসামী।
* ২০১৬ সালের ২৫ মে গাইবান্ধা জেলার গোবিন্ধগঞ্জ থানাধীন মহিমাগঞ্জ বাজারের জুতা ব্যবসায়ী দেবেশ চন্দ্র প্রামানীক হত্যাকান্ডে ব্যবহৃত মোটরসাইকেল সরবরাহ করে।
* বর্তমানে উত্তর বঙ্গের ১৬ টি জেলার নব্য জেএমবি‘র সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। এছাড়া সংগঠনের জন্য নতুন সদস্য সংগ্রহ, অর্থ সংগ্রহ এবং হামলার টার্গেট, ব্যক্তি ও স্থান নির্ধারন করার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিল।

মোঃ দেলোয়ার হোসেন @ মিস্ত্রি @ মিজানুর রহমানের জঙ্গি জীবন ঃ

* ২০০৫ সালে বড় ভাই ইউসুফ হাজীর (২০১৬ সালে বগুড়ায় গ্রেফতার) মাধ্যমে জেএমবিতে যোগদান এবং ২০১২ সাল পর্যন্ত জেএমবিতে অবস্থান করে নওগাঁ, নাটোর, রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় দাওয়াতি কার্যক্রম পরিচালনা করে।
* ২০১৩ সালে নতুন জঙ্গি সংগঠন জুনুদ আত তাওহীদ আল খিলাফাহ এ যোগদান।
* ২০১৪ সালে নব্য জেএমবিতে যোগদান এবং নওগাঁ, জয়পুরহাট, নাটোর, সিরাজগঞ্জ ও বগুড়া জেলার দায়িত্বশীল হিসেবে কার্যক্রম শুরু করে।
* ২০১৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর রাজশাহী জেলার বাঘমারা থানার আহম্মদীয়া মসজিদে বাংলাদেশে প্রথম আত্মঘাতী হামলার প্রধান পরিকল্পনাকারী। উক্ত হামলায় অভিযুক্ত আনোয়ার হোসেন @ নাঈম(২০১৬ সালে রাজশাহীতে পুলিশের সাথে বন্দুকযুদ্ধে নিহত) তার আপন ছোট ভাই। উল্লেখ্য যে, পারিবারিকভাবে নারী/পুরুষ সকল সদস্যই যেমন তার ০৪ ভাই, ০১ ভাতিজা(খায়রুল ২০১৬ সালে বগুড়ায় ধৃত) ও ০১ ভাগনে (মেহেদী বর্তমানে পলাতক) নব্য জেএমবির সক্রিয় সদস্য।
* দেলোয়ার হোসেনের আপন ছোট ভাই মোয়াজ্জেম ২০১৭ সালের ১৬ নভেম্বর নওগাঁ জেলার আত্রাই থানায় জঙ্গি বিরোধী অভিযানে গ্রেফতার হয়।
* ২০১৫ সালে শেষের দিকে বগুড়া জেলার শেরপুর থানাধীন গাড়িদহ ইউনিয়নের জোয়ানপুর কুঠিরভিটা গ্রামে উত্তরবঙ্গের নব্য জেএমবির সর্ববৃহৎ আস্তানা গড়ে তোলে।

বগুড়া শেরপুরের জঙ্গি আস্তানায় যেসব কার্যক্রম পরিচালিত হত ঃ

দেলোয়ার হোসেন সিএনজি চালক হিসেবে বগুড়া শেরপুর থানাধীন গাড়ীদহ ইউনিয়নের জোয়ানপুর কুঠিরভিটা গ্রামের পলি আক্তারের বাসা ভাড়া নিলেও মূলতঃ সেখানে বৃহৎ জঙ্গি আস্তানা গড়ে তোলাই ছিল মূল উদ্দেশ্যে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ বর্ডার থেকে ইউরো বিস্ফোরক জেল, আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদ সংগ্রহ করে এ আস্তানায় মজুদ করা হত। হ্যান্ড গ্রেনেড তৈরির যাবতীয় সামগ্রী দেলোয়ার হোসেন নিজে বগুড়া শহরের বিআরটিসি মার্কেটের বিভিন্ন দোকান থেকে ক্রয় করে উক্ত আস্তানায় নিয়ে যেত। পরবর্তীতে জুয়েল, ফারদিন (উভয়ে শেরপুরে বিস্ফোরনে নিহত) ও সে নিজে হ্যান্ড গ্রেনেড তৈরি করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অন্যান্য জঙ্গি আস্তানায় সরবরাহ করত। পাশাপাশি হিজরতকারী অনেক জঙ্গি সদস্যদের শারীরিক প্রশিক্ষণ প্রদান করা হত এ আস্তানায়।

উত্তরবঙ্গের সর্ববৃহৎ এ জঙ্গি আস্তানায় নব্য জেএমবির প্রথম সারির নেতা তামিম চৌধুরী, মারজান, সাগর, রাজীব গান্ধী, বাবুল মাস্টার, রিপন, কাওছার, ওসমান, মমিন ও রজবসহ অনেকে নিয়মিতভাবে আসা-যাওয়া করত। এ আস্তানা থেকেই ২০১৫-১৬ সালে উত্তরবঙ্গে সংগঠিত বিভিন্ন টার্গেট কিলিং এর পরিচল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। উল্লেখ্য যে, ২০১৫ সালের ২৬ নভেম্বর বগুড়া জেলার শিবগঞ্জে শিয়া মসজিদে হামলায় ব্যবহৃত ০২টি আগ্নেয়াস্ত্র (একে ২২ রাইফেল ও বিদেশী পিস্তল) এ আস্তানা থেকে সরবরাহ করা হয়।

শেরপুরে বিস্ফোরনের দিন যা ঘটেছিল ঃ

নব্য জেএমবির শুরা সদস্য দেলোয়ার হোসেন @ মিস্ত্রি @ মিজানুর রহমান বগুড়া জেলার শেরপুর থানাধীন গাড়ীদহ ইউনিয়নের জোয়ানপুর কুঠিরভিটা গ্রামের পলি আক্তারের বাসা ভাড়া নিয়ে জঙ্গি আস্তানা তৈরি করে। ঘটনার দিন ০৩/০৪/২০১৬ খ্রিঃ তারিখে মাগরিবের নামাজের শেষে জুয়েল ও ফারদিন উক্ত আস্তানায় গ্রেনেড তৈরির কাজ করছিল। একটি গ্রেনেড তৈরি শেষে কালো টেপ দ্বারা পেচিয়ে জুয়েল হাতে নিয়ে নাড়া-চাড়া করছিল এবং দেলোয়ার মিস্ত্রি ও ফারদিন সহ আরো কয়েকজন বসে ঐ সময় রুমের মধ্যে গল্প করছিল। এমন সময় বিদ্যুৎ চলে গেলে দেলোয়ার মিস্ত্রি মোমবাতি জ্বালানোর জন্য রুম হতে বের হওয়া মাত্রই রাত্রি অনুমান ২০.৩০ ঘটিকায় বিকট শব্দে ০১টি গ্রেনেট বিস্ফোরিত হয়। বিস্ফোরনের পর দেলোয়ার মিস্ত্রি জুয়েলকে আহত অবস্থায় টেনে পাশের রুমে নিয়ে যায় এবং ফারদিন ঐ রুমের ভিতরেই আহত অবস্থায় পরে থাকে। পরবর্তীতে জুয়েল ও ফারদিনকে আহত অবস্থানয় ফেলে রেখে দেলোয়ার মিস্ত্রি ০১টি একে ২২ রাইফেল, ০১টি বিদেশী পিস্তল ও কিছু গোলাবারুদ ০১টি ব্যাগে ভরে দ্রুত পিছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে যায়। পালিয়ে যাওয়ার সময় সে উক্ত ব্যাগটি পাশ্ববর্তী আম বাগানের ভিতরে লুকিয়ে রেখে যায়। সে সময় উক্ত আস্তানায় অবস্থানরত অন্যান্য জঙ্গি সদস্যরা যে যার মত করে পালিয়ে যায়। উল্লেখ্য যে, পরবর্তীতে শিয়া মসজিদ হামলার অন্যতম আসামী কাওছার(২০১৬ সালে বগুড়ায় পুলিশের সাথে বন্দুকযুদ্ধে নিহত) দেলোয়ারের কাছ থেকে তথ্য প্রাপ্ত হয়ে আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যাগটি মমিন (বর্ণিত অস্ত্রগুলোসহ ২০১৬ সালে গ্রেফতার) এর বাড়িতে (শাজাহানপুরে) রেখে যায়।

পরিকল্পনা যা ছিল ঃ

ধৃতদের একাধিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায় যে, তারা রাজধানী ঢাকায় বড় ধরনের হামলার পরিকল্পনা গ্রহন করেছিল । সে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য পূর্ব প্রস্তুতি গ্রহনের লক্ষ্যে তারা ঢাকা যাওয়ার সিদ্ধান্ত চুড়ান্ত করে। তাদের গ্রেফতারের মাধ্যমে নিকট ভবিষ্যৎতে রাজধানী ঢাকায় বড় ধরনের হামলা প্রতিহত করা সম্ভব হয়েছে।

Facebook Comments (ফেসবুকের মাধ্যমে কমেন্ট করুন)

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
আপনার নাম লিখুন