বগুড়া সংবাদ ডট কম (শিবগঞ্জ প্রতিনিধি রশিদুর রহমান রানা) : উপজেলার গুজিয়া হাটের সরকারি জায়গা ও রাস্তা দখল করে দোকানঘর নির্মাণ করার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় জাতীয় পার্টি ও আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতাসহ অনেকের বিরুদ্ধে। এরপরও স্থানীয় প্রশাসন এ ব্যাপারে কোন পদক্ষেপ নিচ্ছে না বলেও অভিযোগ উঠেছে। এতে হাট দিন দিন ছোট হয়ে যাচ্ছে। স্থানীয় অনেকেই জানান, প্রশাসন যেভাবে নমনীয়তা দেখাচ্ছে, আর যেভাবে দখলের হিড়িক চলছে, তাতে হয়তো হাটটি বিলুপ্তি হতে খুব বেশিদিন লাগবে না!
সরেজমিনে ঘুরে জানা গেছে, এলাকার প্রভাবশালীরা হাটের বিভিন্ন জায়গা দখল করে রেখেছে। বর্তমানে হাটের অনেকটা অংশ দখলদারদের হাতে চলে গেছে। এতে হাট ছোট হয়ে যাওয়ায় ব্যবসায়ীদের স্থান সংকুলান হচ্ছে না। এ বছর প্রায় সাড়ে ৬ লাখ টাকায় হাটটি ইজারা দেওয়া হয়েছে। তবে দখলদারদের উচ্ছেদ করতে পারলে দ্বিগুণ টাকায় হাট ইজারা দেওয়া সম্ভব বলে জানিয়েছেন হাটের ব্যবসায়ীরা। দখলদারদের কারনে সরকার লাখ লাখ টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে বলেও জানান স্থানীয়রা।
ইউনিয়ন ভূমি কার্যালয়ের তালিকা অনুযায়ী, গুজিয়া হাটের মোট জায়গা ১ একর ৩৪ শতক। এর মধ্যে প্রায় ৬০ শতক জায়গা স্থানীয় প্রভাবশালীরা দখল করেছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, সেখানে তারা স্থায়ী দোকানপাট বসে দাপটের সাথে ব্যবসা করলেও অজ্ঞাত কারণে স্থানীয় প্রশাসন নিশ্চুপ। এর আগে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয় থেকে শুধুমাত্র নোটিশ প্রদান করা ছাড়া কোন পদক্ষেপ নেয়া হয়নি বলেও জানান স্থানীয়রা।
সরেজমিন দেখা যায়, হাটের জায়গা দখল করে অবৈধভাবে স্থায়ী দোকান নির্মাণ করেছেন শিবগঞ্জ ইউনিয়ন জাতীয় পার্টির সভাপতি তোতা মিয়া। তিনি অবৈধভাবে প্রায় পৌনে ০৩ শতক জমির উপর তিন দোকান বিশিষ্ট ছাদ ঢালাই মার্কেট নির্মাণ করেছেন। হাটের সরকারী জায়গার উপর অবৈধভাবে ঘর নির্মাণ করা সম্পর্কে তাকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, সবাইকে ম্যানেজ করেই মার্কেট নির্মাণ করেছি। এখনও ম্যানেজ করেই ব্যবসা পরিচালনা করছি। এমনকি এমপি মহোদয়কেও বিষয়টি জানিয়েছি। তিনি অবশ্য আমাকে ভেজাল না করে লিজ নেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
এদিকে হাটের প্রায় ০২ শতক জায়গা দখল করে স্থায়ী দোকান গড়েছেন ইউনিয়ন আওয়ামীলীগ সভাপতি বেনজির হোসেন। তিনি সেখানে গ্যাসের চুলা, সিলিন্ডারসহ ইলেকট্রনিক সামগ্রী বিক্রি করেন। এ বিষয়ে তিনি বলেন, জায়গা পড়ে আছে, তাই দোকান দিয়েছি। সব পক্ষকে ম্যানেজ করেই হাটের জায়গা নিয়েছি।
এছাড়াও হাটের জায়গার উপর অবৈধভাবে তৈরি করা হয়েছে, হুদাবালার মৃত তমিজ উদ্দিনের পুত্র হেলাল উদ্দিন এর ভুষিমাল এর স্থায়ী দোকান, মাঝপাড়ার নজমুল হুদার পুত্র রিজুনুল হুদার স্থায়ী গ্রিলের দোকান, হুদাবালার মৃত ফজলুর রহমানের পুত্র আব্দুর রহিমের ওষুধের দোকান, বালা বত্রিশের নুরুল ইসলামের পুত্র নজরুল ইসলাম এর ওষুধের দোকান, নারায়নপুরের অমুল্য সাহার পুত্র শ্রী স্বপন কুমার সাহার ভুষি মালের দোকান, মাঝপাড়া গ্রামের শামছুল হকের পুত্র চানমিয়া ও মোকলেছার এর ওষুধের দোকান, একই গ্রামের বদিউজ্জামানের পুত্র তাহাজ্জত আলীর জুতার দোকান, উত্তর শ্যামপুরের ফারাজ উদ্দিনের পুত্র নুরুল ইসলামের ভুষিমালের দোকান, হুদাবালা গ্রামের মৃত আবেদ হোসেনের পুত্র আমিনুল ইসলামের কসমেটিক দোকান, মেদেনীপাড়া গ্রামের আজিজার রহমানের পুত্র লুৎফর হোসেনের ফ্লেক্সিলোডের দোকান, গুজিয়ার মৃত তমিজের উদ্দিনের মোস্তফা আহমেদ এর ওষুধ ও আব্দুর রহমান এর ভুষিমালের দোকান, গুজিয়ার আব্দুল হামিদের পুত্র আবু বক্কর সিদ্দিক এর দই মিষ্টির দোকান।
এসব অবৈধ জায়গা দখল করা দোকানীরা বলেন, আমরা এখানে স্থায়ীভাবে পাকা দোকান করেছি, এটা কি রাতারাতি তৈরি হয়েছে? তারা দোকানপাট তৈরি করতে কোন লুকোচুরি করেনি এবং এ ব্যাপারে সবাই জানেন বলেও দাবি করেন।
এলাকার কয়েকজন বাসিন্দার সাথে কথা বললে তারা জানান, গুজিয়া হাটের জায়গা ছাড়াও রাস্তাও দখল করেছে স্থানীয় প্রভাবশালীরা। দখলদাররা প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলের সদস্য বলে কেউ প্রতিবাদ করতে সাহস পায় না। তাছাড়া এলাকাবাসী অভিযোগ করেন, স্থানীয় প্রশাসনকে ম্যানেজ করেই তারা দোকানপাট নির্মাণ করেছেন, এখানে আমাদের করার কি আছে?
স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান তোফায়েল আহমেদ সাবু বলেন, বিষয়টি আমিও জানি। তিনি এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও সহকারী কমিশনারের (ভূমি) হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) সুশান্ত কুমার মাহাতো’র কাছে গুজিয়া হাটের অবৈধ স্থাপনার সংখ্যা ও জমির পরিমাণের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কোন সদুত্তর না দিয়ে বলেন, আপনারা আপনাদের মতো সংবাদ পরিবেশন করুন। শুধু গুজিয়ায় নয়, শিবগঞ্জের প্রায় সব হাটের জায়গায় অবৈধ দখলদাররা দখল করেছে। উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে পর্যায়ক্রমে সব হাট দখলমুক্ত করা হবে।
এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আলমগীর কবির বলেন, যাঁরা অবৈধভাবে দোকানঘর নির্মাণ করেছেন, ডিসি স্যারের সাথে কথা বলে তাঁদের বিরুদ্ধে অচিরেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক নুরে আলম সিদ্দিকী বলেন, শিবগঞ্জের হাটগুলো থেকে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে আমি ইউএনও সাহেব নির্দেশ দিবো। আপনারা অচিরেই দখলদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা দেখতে পাবেন।

Facebook Comments (ফেসবুকের মাধ্যমে কমেন্ট করুন)

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
আপনার নাম লিখুন