বগুড়া সংবাদ ডট কম (জিয়াউর রহমান, বগুড়া) : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে সম্ভাব্য প্রার্থীদের পদচারণা মূখর হতে শুরু করেছে নির্বাচনী এলাকা ৪২ বগুড়া-৭ আসন। গাবতলী এবং শাজাহানপুর উপজেলা নিয়ে গঠিত এই আসনটির গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ি গ্রামে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)’র প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জন্ম হওয়ায় বিএনপির দুর্গ বলে পরিচিত। আর এই দুর্গে আঘাত হানতে প্রস্তুতি নিচ্ছে আওয়ামীলীগ ও অন্যান্য সম্ভাব্য প্রার্থীরা। ইতোমধ্যে সম্ভাব্য প্রার্থীদের পদচারনায় মূখর হতে শুরু করেছে নির্বাচনী এলাকা ৪২ বগুড়া-৭।
বিএনপির দূর্গ ঘোষিত এই আসনটিতে বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া পর পর তিন বার নির্বাচিত হয়ে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। দলীয় নেতা-কর্মিদের প্রত্যাশা আগামী একাদশ সংসদ নির্বাচনেও বেগম খালেদা জিয়া এ আসনে প্রার্থী হবেন। তবে দলের শীর্ষ নেতা বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান প্রার্থী না হলে বিকল্প সম্ভাব্য প্রার্থী হতে পারেন তারেক রহমানের পত্নী ডা. জোবাইদা রহমান এবং বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা সাবেক এমপি হেলালুজ্জামান তালুকদার লালু।
বর্তমানে জাতীয় সংসদের এই আসনটি অলংকিত করে রেখেছেন মহাজোট সরকারের এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পাটির প্রার্থী এড. আলতাফ আলী। সর্বশেষ তথ্য অনুসারে শাজাহানপুর উপজেলার ২ লাখ ১৫ হাজার ৮২৫ এবং গাবতলী উপজেলার ১ লাখ ৯৫ হাজার ৯২৬ জন ভোটারের এই আসনটিতে ২০১৪ সালে দশম সংসদ নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০দলীয় জোট নির্বাচন বর্জন করলে মহাজোট সরকারের আনোয়ার হোসেন মুঞ্জু’র নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টির প্রার্থী আমিনুল ইসলাম সরকার পিন্টুকে পরাজিত করে আসনটি অলংকিত করেন তিনি। এই আসনের বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থা নিয়ে সাধারন ভোটারদের সাথে কথা বলে জানা গেছে বর্তমান এমপি জাতীয় পার্টির অ্যাডভোকেট আলতাফ আলী জনবিচ্ছিন্ন নেতা হিসেবে নিজ দলেই চিহ্নিত হয়েছেন। দলের সম্মেলনে কেন্দ্রীয় নেতাদের সামনেই তিনি কয়েক দফা শারীরিক ভাবে লাঞ্চিত হয়েছেন। এছাড়া কমিশন নিয়ে ডিও লেটার দেয়া, বিভিন্ন বরাদ্দ থেকে টাকা নেয়ার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে এলাকায় বিক্ষোভ ও কুশ পুত্তলিকা দাহ করে সাধারন মানুষ। জাতীয় পার্টির একাধিক নেতাকর্মী অভিযোগ করে জানান দুই উপজেলার নেতাকর্মীদের সাথে তার কোন সম্পৃক্ততা না থাকায় তিনি অনেকটা জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন। এই অবস্থায় তারা আসন্ন নির্বাচনে নতুন মুখের মনোনয়ন চাইবেন। তবে বগুড়া-৭ আসনের বর্তমান এমপি অ্যাডভোকেট আলতাফ আলী জানান, এখনই কিছু বলা যাচ্ছে।
একাদশ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে এক বছরেরও অধিক সময় বাকি থাকলেও নির্বাচনী এলাকায় দলীয় কর্মসূচি এবং বিভিন্ন সামাজিক কর্মকান্ডে উপস্থিত হয়ে সুশীল সমাজের সাথে কুশল বিনিময় করে নিজেকে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে পরিচিত করে তুলতে শুরু করেছেন বিভিন্ন দলের সম্ভাব্য প্রার্থীরা। এছাড়াও ঈদ কার্ড, শুভেচ্ছা পোষ্টার, প্যানা সাইন বোর্ড টানিয়ে প্রচার-প্রচারনা চালিয়ে যাচেছন তারা।
বিএনপির দূর্গ খ্যাত এই আসনে নবম সংসদের উপ-নির্বাচন থেকে আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা পূর্বের তুলনায় বেড়েছে। তাই একাদশ সংসদ নির্বাচনে আওয়ামীলীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট থেকে মনোনয়ন পেতে হাই কমান্ডে লবিং শুরু করেছেন অনেকেই। যাদের নাম শোনা যাচ্ছে তারা হলেন বগুড়া জেলা আওয়ামীলীগের সহ সভাপতি বিএমএ সভাপাতি ডা. মোস্তফা আলম নান্নু, জেলা আওয়ামীলীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক টি. জামান নিকেতা, সাংগঠনিক সম্পাদক ও জেলা পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান একেএম আছাদুর রহমান দুলু, সাবেক এমপি কামরুন নাহার পুতুল এবং কৃষকলীগের কেন্দ্রীয় ক্ষেতমজুর বিষয়ক সম্পাদক ইমারত আলী, বর্তমান সংসদ সদস্য এড. আলতাফ আলী, জাতীয় পাটির সাবেক এমপি ও জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান জাপা (মুঞ্জু) নেতা আমিনূল ইসলাম সরকার পিন্টু, গাবতলী উপজেলা আওয়ামীলীগ সভাপতি ও বগুড়া জেলা পরিষদ সদস্য এ.এইচ আজম খান, শাজাহানপুর উপজেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক তালেবুল ইসলাম, জেলা মহিলা আওয়ামীলীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক হেফাজত আরা মিরা, জাতীয় পাটি বগুড়া জেলা শাখার যুগ্ম-সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল মামুন এবং গাবতলী উপজেলা জাতীয় পাটির সভাপতি লিয়াকত আলী সরকার, শাজাহানপুর উপজেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি সার্জেণ্ট (অব:) আব্দুল হান্নান এবং উপজেলা জাপা নেতা সাংবাদিক রেজাউল করিম বাবলু।
অপরদিকে শাজাহানপুরে বিএনপির মাঠ পর্যায়ের নেতা-কর্মিদের প্রত্যাশা দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দের মধ্য থেকেই এ আসনে প্রার্থী হবেন। তাই স্থানীয় নেতারা এ আসনে মনোনয়ন চাওয়ার কথা ভাবতেও পাচ্ছেন না। তবে সাধারণ মানুষের মুখে মুখে শোনা যাচ্ছে, বিশেষ কারণে শীর্ষ নেতৃবৃন্দের কেউ প্রার্থী না হলে দলের প্রয়োজনে হাইকমান্ডের নির্দেশে দলীয় মনোনয়ন চাইতে পারেন জেলা বিএনপির কৃষি বিষয়ক সম্পাদক শাজাহানপুর উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আবুল বাশার এবং জেলা বিএনপির সদস্য শাজাহানপুর উপজেলা চেয়ারম্যান সরকার বাদল।
তরুন নেতা নেতা হিসেবে আবুল বাশারই এখন এই অঞ্চলে বিএনপির রাজনীতির একমাত্র কান্ডারী। বিগত দিনে সরকার বিরোধী আন্দোলন-সংগ্রামে উল্লেখ যোগ্য ভুমিকা রাখায় দলীয় ভাবে প্রশংসা পেয়েছেন এই তরুন নেতা। দলকে গোছানো থেকে শুরু করে নেতাকর্মীদের এবং সাধারন মানুষের সুখে দু:খে পাশে থাকছেন তিনি। বারবার কারা বরন করা এই নেতা সাধারন কর্মীদের রাজনৈতিক মামলাগুলো পরিচালনার ক্ষেত্রে সহযোগিতা করেন। বিএনপির নেতাকর্মীরা বলেন, প্রথমত আমরা চাই ঐতিহ্য অনুসারে জিয়া পরিবারের কেউ এই আসনে প্রার্থী হোক। আমরা জানপ্রান দিয়ে তার জন্য মাঠে থাকবো। কোন কারনে তারা কেউ প্রার্থী না হলে বিকল্প হিসেবে আমরা তরুন নেতা বাশারকে চাই। তিনি মাঠের নেতা। নির্বাচিত হলে এলাকার উন্নয়নে কাজ করবেন বলে আমাদের বিশাস।
অন্যান্য সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে বগুড়া জেলা বিএমএ সভাপাতি ডা. মোস্তফা আলম নান্নু এবং ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সদস্য পদ গ্রহনের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রবেশ করে জেলা ছাত্রলীগ, যুবলীগের সফল নেতৃত্বদানকারী বর্তমানে জেলা আওয়ামীলীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক টি. জামান নিকেতাকে রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকান্ডে মাঠে-ময়দানে দেখা যাচ্ছে। জানালেন মনোনয়ন পেলে নৌকার বিজয় আনবো। আর মানুষের সেবায় কাজ করে যাবো।
অপরদিকে নির্বাচনী এলাকা গাবতলী ও শাজাহানপুরের ওলি-গলি চষে বেড়াচ্ছেন বগুড়া জেলা আওয়ামীলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও জেলা পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান একেএম আছাদুর রহমান দুলু। আমরুল ইউনিয়নের কৃতি সন্তান এক সময়ের রাজপথ কাঁপানো তুখোর ছাত্রনেতা আজকের এই আছাদুর রহমান দুলু ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের প্রাথমিক সদস্য পদ গ্রহনের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রবেশ করেন। এরপর ১৯৮১ সালে সরকারি শাহ্ সুলতান কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি নির্বাচিত হন তিনি। শুরু হয় বগুড়ার রাজনৈতিক অঙ্গনে দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলা। তখন থেকেই আর পিছু তাকাতে হয়নি তার। ১৯৮৬ সাল থেকে একটানা ৯ বছর বগুড়া জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি, ২০০৪ সাল থেকে জেলা স্বেচ্ছাসেবকলীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও কেন্দ্রিয় কমিটির সিনিয়র সদস্য, বর্তমানে জেলা আওয়ামীলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক, ২০১৬ সালে ডিসেম্বরে বগুড়া জেলা পরিষদ নির্বাচনে বিপুল ভোটে সদস্য নির্বাচিত হয়ে প্যানেল চেয়ারম্যান-১ এর দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া জেলা ক্রীড়া সংস্থার নির্বাহী সদস্য, জেলা ফুটবল এসোসিয়েশনের সহ-সভাপতি সহ রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকান্ডে নিজেকে জড়িয়ে সমান তালে এগিয়ে চলেছেন তিনি। প্রতি বছর ধর্মীয় উৎসব গুলোতে দরিদ্রদের মাঝে শাড়ী, লুঙ্গি, সেমাই, চিনি বিতরন, বন্যার্ত অসহায় মানুষের পাশে দাড়ানো সহ সামাজিক কর্মকান্ডের কারনে গাবতলী ও শাজাহানপুরবাসির অনেক কাছাকাছি যেতে পেরেছেন এই ত্যাগী নেতা। তার এই রাজনৈতিক এবং সামাজিক কর্মকান্ডের ভিত্তিতে একাদশ সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশা করেছেন তিনি।
বিএমএ বগুড়া জেলা শাখার সভাপতি ডা. মোস্তফা আলম নান্নু নিজেকে যোগ্য প্রার্থী মনে করেন। তিনিও নৌকার মাঝি হতে মাঠে রয়েছেন।
শাজাহানপুর উপজেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক তালেবুল ইসলাম নিজের রাজনৈতিক জীবনের বর্ননা দিতে গিয়ে বলেন, এলাকায় সামলাতে হয় আমাদের। মাঠে আমরা সব সময় থাকি। রাজনীতির দীর্ঘ জীবনে দলে আমার কোন দূর্নাম নেই। সাধারন মানুষ আমাকে সব সময় কাছে পায়। দলের হাইকমান্ড বিষয়টি জানে। এখন দল থেকে তাকে যোগ্য মনে করলে তিনি প্রার্থী হবেন। এখানে নৌকার জন সমর্থন আগের চেয়ে বেড়েছে বহুগুন। এ কারনে দল তাকে মনোনয়ন দিলে তিনি বিজয়ী হবেন।
‘শ্রমজীবি, কর্মজীবি, পেশাজীবি জনগন এক হও’ শ্লোগানকে সামনে রেখে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি) থেকে নির্বাচনে অংশ নেয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন জেএসডি’র কেন্দ্রিয় সদস্য ও বগুড়া জেলা শাখার সহ সভাপতি মনিরুজ্জামান বাচ্চু এবং কেন্দ্রিয় সদস্য ও জেলা শাখার যুগ্ম সম্পাদক প্রভাষক রিয়াজুল মোরশেদ টিটু। এছাড়া বিকল্পধারা বাংলাদেশ বগুড়া জেলা শাখার সভাপতি রোটা: মেজবাউল আলমের নামও শোনা যাচ্ছে। তবে নির্বাচন নিয়ে শাজাহানপুরে জামায়াতের এখন পর্যন্ত কোন তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না।
এই সমস্ত সম্ভাব্য প্রার্থীরা গত ঈদ-উল-ফিতর থেকেই দলীয় কর্মসূচি ও সামাজিক কর্মকান্ডে তাদের অংশ গ্রহন বাড়িয়েছেন এবং তৃণমূল নেতা-কর্মিদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে চলেছেন। সবমিলিয়ে সম্ভাব্য প্রার্থীদের পদচারনা মূখর হয়ে উঠতে শুরু করেছে নির্বাচনী এলাকা ৪২ বগুড়া-৭ আসন।

Facebook Comments (ফেসবুকের মাধ্যমে কমেন্ট করুন)

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
আপনার নাম লিখুন