বগুড়া সংবাদ ডট কম : বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলায় হাটবাজার উন্নয়নের নামে ৭৬টি প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় দেড় কোটি টাকা লোপাট করা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। বেশিরভাগ প্রকল্পে কোনো কাজ করা হয়নি। কাগজ কলমে থাকলেও বাস্তবে গিয়ে কোনো প্রকল্পের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। অথচ প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন হয়েছে দাবি করে বরাদ্দের সমুদয় টাকা তুলে নিয়ে আত্মসাৎ করা হয়েছে। গত এক সপ্তাহ ধরে সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের হাটবাজারে গিয়ে এ চিত্র পাওয়া গেছে।
উপজেলা পরিষদের একটি সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের মার্চ মাসে অনুষ্ঠিত উপজেলা পরিষদের মাসিক সভায় বাংলা ১৪২৩ সনের হাট বাজারের ইজারালব্ধ আয়ের শতকরা ১৫ ও ১০ ভাগ অর্থ দিয়ে উপজেলার সকল হাট বাজারের উন্নয়নের জন্য প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। প্রকল্পের নাম দেওয়া হয় হাটবাজার উন্নয়ন প্রকল্প। গত ৩০ জুন এ প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন হওয়ার কথা। যথাসময়ে প্রকল্পগুলোর কাজ সম্পন্ন দেখিয়ে ৭৬টি প্রকল্পের বিপরীতে বরাদ্দ করা এক কোটি ৪১ লাখ ৫৮ হাজার ৩২৫ টাকাই উত্তোলন করা হয়েছে।
সূত্র জানায়, ওই প্রকল্পের আওতায় উপজেলার ১২টি ইউনিয়নেই হাট বাজার উন্নয়নের নামে অর্থ বরাদ্দ করে উপজেলা পরিষদ। এরমধ্যে ময়দানহাটা ইউনিয়নের ১০টি প্রকল্পে ১৮ লাখ ৮০ হাজার টাকা, কিচকের ১০টি প্রকল্পে ২০ লাখ টাকা, বুড়িগঞ্জের ১০টি প্রকল্পে ১৭ লাখ ২৪ হাজার ৯৯৫ টাকা, শিবগঞ্জের ৬টি প্রকল্পে ১১লাখ ৮৭ হাজার ৭৫০ টাকা, পীরবের ৬টি প্রকল্পে ১১লাখ ৫০ হাজার টাকা, মোকামতলার ৭টি প্রকল্পে ১৩ লাখ ৬৫ হাজার ১৬৫ টাকা, আটমূল ইউনিয়নের ৩টি প্রকল্পে ৮লাখ ৭০ হাজার ৮০০ টাকা, সৈয়দপুরের ৩টি প্রকল্পে ৬লাখ টাকা, রায়নগরের ৯টি প্রকল্পে ১৮ লাখ টাকা, দেউলীর তিনটি প্রকল্পে ৫লাখ ৭৯ হাজার ৬৭৫ টাকা, বিহারের ৩টি প্রকল্পে ৬লাখ টাকা এবং মাঝিহট্ট ইউনিয়নের ২টি প্রকল্পে ৪ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। সরেজমিন প্রকল্পগুলো পরিদর্শনে গিয়ে হাট উন্নয়নের কোনো ছোঁয়া দেখা যায়নি। ময়দানহাটা ইউনিয়নের দাড়িদহ হাটের উন্নয়নের নামেই পৃথক করে ১০টি প্রকল্প দেখানো হয়। প্রত্যেকটি প্রকল্পে সর্বনিম্ন দেড় লাখ টাকা থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত প্রকল্প ব্যয় ধরা হয়। ওই ১০টি প্রকল্পের আওতায় রয়েছে ২লাখ টাকা ব্যয়ে টয়লেট সংস্কার, ২লাখ টাকা ব্যয়ে মাছ পট্টিতে ড্রেনের ওপরে স্লাব নির্মাণ ও ইট বিছানো, ২লাখ টাকা ব্যয়ে কসাইপট্টিতে গরু-ছাগল জবাইয়ের সেড নির্মাণ, ২লাখ টাকা ব্যয়ে হাটুরে পাড়া থেকে জালালের বাড়ি পর্যন্ত রাস্তায় ইট বিছানো, এক লাখ ৮০ হাজার টাকা ব্যয়ে কলাপট্টিতে মসজিদ সংস্কার ও কেন্দ্রীয় মসজিদে এয়ারকুলার প্রদান, ২লাখ টাকা ব্যয়ে পওতা ক্লাবের সামনে থেকে বাঁশঝাড় পর্যন্ত ড্রেন নির্মাণ, দেড় লাখ টাকা ব্যয়ে পওতা হিন্দুপাড়ায় ড্রেন নির্মাণ, দেড়লাখ টাকা ব্যয়ে পওতা নামা পাড়া রাস্তায় ইট বিছানো, দুই লাখ টাকা ব্যয়ে ডা. শাহিনুরের দোকান থেকে পাকা রাস্তা পর্যন্ত রাস্তায় ইট বিছানো এবং দুই লাখ টাকা ব্যয়ে দাঁড়িদহ হাট জামে মসজিদ সংলগ্ন রাস্তা সংস্কার।
প্রকল্পগুলোর কাজের খোঁজ নিতে গেলে হাটের দোকানী ও স্থানীয় বাসিন্দারা বিস্ময় প্রকাশ করেন। তারা বলেন, এমন কোনো প্রকল্পের বিষয় তাদের জানা নেই। হাটের ভেতরে একমাত্র শৌচাগারটি এখনও রয়েছে জরাজীর্ণ অবস্থায়। ওই শৌচাগার পরিচ্ছন্ন করার কাজে নিয়োজিত বুলু বাঁশফোড় জানান, সংস্কার তো দূরের কথা, সেটি রং পর্যন্ত করা হয়নি। ওই শৌচাগার সংস্কারে ২ লাখ টাকার অর্থ বরাদ্দের বিষয়ে তার জানা নেই। শৌচাগারের পাশেই মাংসপট্টি। সেখানকার স্থায়ী দোকানী কমল মিয়া জানান, আগেও যেমন তারা সামিয়ানা টাঙিয়ে মাংস বিক্রি করতেন, এখনও তাই করছেন। সেখানে ২ লাখ টাকা ব্যয়ে সেড নির্মাণ হবে এমন কথাও তারা শোনেননি। বহু আগে ওই হাটে যে শেড নির্মাণ করা হয়েছিলো, সংস্কারের অভাবে সেই সেডটিই এখন পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। মাছপট্টি ঘুরে দেখা যায় সেখানে ২ লাখ টাকার কোনো ইট বিছানো হয়নি, এছাড়া ওই পট্টির পাশে আগে থেকেই একটি ড্রেন থাকলেও তাতে কোনো স্লাব দেওয়া হয়নি। নামে প্রকল্পগুলো থাকলেও সেসব প্রকল্পের কোনো কাজই করা হয়নি। একই অবস্থা দেখা গেছে শিবগঞ্জ সদর ইউনিয়নের গুজিয়াহাটের প্রকল্পগুলোর ক্ষেত্রেও। সেখানে মাংসপট্টিতে সেড নির্মাণের নামে ২লাখ এবং মাছপট্টিতে সেড নির্মানের নামে ২লাখ টাকা করে বরাদ্দ দেখানো হয়। অথচ ওই হাটের একটি পুরাতন সেডে ৪টি খুঁটি নির্মাণ করে তার ওপরে টিনের চালা দিয়ে পুরো ৪লাখ টাকাই আত্মসাৎ করা হয়েছে। এর চেয়েও চমকপ্রদভাবে প্রকল্প দেখানো হয়েছে কিচক হাট উন্নয়ন প্রকল্পে। সেখানে একই রাস্তার একপ্রান্ত থেকে অপর প্রন্তে বালু ভরাট করণের নামে শুধুমাত্র উত্তর থেকে দক্ষিণ বা দক্ষিণ থেকে উত্তর উল্লেখ করে সমুদয় টাকা লোপাট করা হয়েছে। ওই হাটের একটি রাস্তায় ইট বিছানোর কথা বলে প্রকল্প করা হলেও সেই রাস্তাটি অনেক আগে থেকেই ইট বিছানো অবস্থায় রয়েছে। আর ওই হাটের মাঠ ভরাট করতে বালু ফেলার নামে পৃথক তিনটি প্রকল্প দেখিয়ে ৬লাখ টাকা হাওয়া হয়ে গেছে। মহাস্থানহাটের নামে গ্রহণ করা ৭টি প্রকল্পেও কোথাও কোনো কাজ হয়নি। পুরা টাকায় আত্মসাৎ তরা হয়েছে।
উপজেলার অন্যান্য ইউনিয়নের হাট বাজারের নামে গৃহীত প্রকল্পগুলোতেও একইভাবে টাকা লোপাট করা হয়েছে।
শিবগঞ্জ উপজেলা পরিষদের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, উপজেলা পরিষদ থেকে ২লাখ টাকার অধিক যেকোনো প্রকল্প গ্রহণ করা হলেই উন্মুক্ত দরপত্রের (টে-ার) মাধ্যমে কাজ করার বিধান। আর দরপত্র আহ্বান করে কাজ দিলে তা বুঝে নিতেই হবে। একারণে কৌশলের আশ্রয় নিয়ে একই হাট এলাকায় একাধিক প্রকল্প তৈরি করে টাকাগুলো ভাগ-বাটোয়ারা করে নেওয়া হয়েছে। এসব হাওয়া-ই প্রকল্পের বিষয়ে দরপত্র না হওয়ার কারণে কেউ কিছু জানতেও পারেনি। ফলে স্থানীয় এলাকাবাসী যে কাজ বুঝে নেওয়া জন্য চাপ দিবে তাও সম্ভব নয়। কাগজে-কলমে প্রকল্প থাকলেও কেউ জানতেই পারেনি কোন প্রকল্পে কি কাজ এবং কতো টাকা বরাদ্দ হয়েছে।
ময়দানহাট্টা ইউপির সদস্য ও দাড়িদহ হাটের শৌচাগার সংস্কার ও মেরামত প্রকল্পের চেয়ারম্যান শহিদুল ইসলাম বলেন, কাজ এখন শুরু করা হয়নি। চেয়ারম্যান সাহেব দেরি করছে। শুধু এ প্রকল্পই নয়, এ ইউনিয়নে আরও সাতটি প্রকল্প আছে যার কোনোটার কাজই শুরু হয়নি।
শিবগঞ্জ উপজেলা ময়দানহাট্টা ইউপির চেয়ারম্যান এসএম রুপম টাকা আত্মসাতের অভিযোগ অস্বীকার বলেন, বেশ কটি প্রকল্পের কাজ শেষ হয়েছে। অন্যগুলির কাজ বন্যার কারণে এবং ইউএনও মহোদয় ছুটিতে থাকায় শুরু করা যায়নি। দু- একদিনের মধ্যে শুরু করা হবে।
বৃহস্পতিবার দুপুরে জানতে চাইতে শিবগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলী মো: সালাহউদ্দিন জানান, অফিসের কাজে বর্তমানে রাজশাহীতে অবস্থান করছি। এই মুহূর্তে কিছু বলা সম্ভব নয় উল্লেখ করে তিনি উপ সরকারী প্রকৌশলীর সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন।
শিবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) গোলাম মো: শাহনেওয়াজ অনেক প্রকল্পের কাজই সম্পন হয়েছে উল্লেখ করে বলেন, আমার জনবল কম, তাই সব প্রকল্প দেখা সম্ভব হয়নি। তবে কোনো প্রকল্পের কাজ না হয়ে থাকলে এখনও করে নেয়ার সুযোগ আছে। ৩০ জুন নয়, এ প্রকল্পের কাজ সব সময় করা যাবে। তারপর কোনো প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Facebook Comments (ফেসবুকের মাধ্যমে কমেন্ট করুন)

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
আপনার নাম লিখুন