বগুড়া সংবাদ ডট কম (ধুনট প্রতিনিধি ইমরান হোসেন ইমন) : বগুড়ার ধুনটে গ্রামীণ অবকাঠামো সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ (টিআর, কাবিটা, কাবিখা) প্রকল্পের কাজ না করেই কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগ উঠেছে। প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার যোগসাজসে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক দলের কতিপয় লোকজন কোন কাজ না করেই ভুয়া বিল ভাউচার তৈরী করে সরকারী বরাদ্দের প্রায় পৌনে ২ কোটি টাকার মধ্যে প্রায় কোটি টাকাই লোপাট করেছেন।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিসসূত্রে জানাগেছে, ২০১৭-১৮ অর্থ বছরে গ্রামীন অবকাঠামো সংস্কার (কাবিটা) ১ম পর্যায়ে সাধারন কর্মসূচির আওতায় ৭টি প্রকল্পের নামে ২৩ লাখ ৫৩ হাজার ৫৮২ টাকা এবং বিশেষ ৯টি প্রকল্পের নামে ২৮ লাখ ৮১ হাজার ৪৯৯ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। ২য় পর্যায়ে কাবিটা সাধারন কর্মসূচির আওতায় ৬টি প্রকল্পে ২৭ লাখ টাকা মূল্যের ৬০ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য (চাল) বরাদ্দ দেওয়া হয়। এছাড়া বিশেষ ৮টি প্রকল্পের নামে ২৮ লাখ ৮০ হাজার টাকা মূল্যের ৬৪ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য (চাল) বরাদ্দ দেওয়া হয়। টিআর ১ম পর্যায়ে বিশেষ ৫৪টি প্রকল্পের নামে ২৪ লাখ ৩৪ হাজার ৬০১ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। টিআর ১ম পর্যায়ে সাধারন কর্মসূচির আওয়াতায় ২১ টি প্রকল্পের নামে ১৬ লাখ ৪৩ হাজার ৯৭৯ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। টিআর (ট্রেড রিলিফ) ২য় পর্যায়ে সাধারন কর্মসূচির আওতায় উন্নয়ন খাত ২য় পর্যায়ে ১৮টি প্রকল্পের নামে নগদ অর্থ বরাদ্দ করা হয় ১৬ লাখ ৪২ হাজার ৮৯০ টাকা। টিআর বিশেষ ৬০টি প্রকল্পে নগদ বরাদ্দ দেওয়া হয় ২৪ লাখ টাকা।
সরকারী নীতিমালা অনুযায়ী ৩০ জুনের মধ্যে শতভাগ কাজ করার নির্দেশ থাকলেও প্রায় ৮০ ভাগ প্রকল্প কাজ না করেই কাগজ কলমে শত ভাগ কাজ দেখিয়ে ভুয়া মাষ্টাররোলের মাধ্যমে এসব প্রকল্পের অনুকুলে বরাদ্দকৃত অর্থ ও খাদ্যশস্য উত্তোলন করে ভাগবাটোয়ারা করে নেওয়া হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ‘বিল কাজুলী পোষ্ট অফিসের আসবাবপত্র ক্রয়ের জন্য টিআর প্রকল্পে ৪০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু সরেজমিনে ওই পোষ্ট অফিসের কোন অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া যায়নি।
এবিষয়ে ধুনট উপজেলা পোষ্ট অফিসের পোষ্ট মাষ্টার বাবুল আকতার বলেন, ওই নামে ধুনট উপজেলায় কোন পোষ্ট অফিসই নাই।
‘কোনাগাঁতি হাফেজিয়া মাদ্রাসার’ উন্নয়নের জন্য টিআর প্রকল্পের ১ লাখ ৭০ হাজার টাকা উত্তোলন করে ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা আত্নসাত করা হয়েছে। মাদ্রাসার মহতামিম মাওলানা ইসমাইল হোসেন জানান, কত টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে তা তিনি জানেন না। তবে পিআইও অফিস থেকে তাকে মাত্র ৩০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে। গোশাইবাড়ি দি মনিং সান উচ্চ বিদ্যালয়ে নামের ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে ৮০ হাজার টাকা বরাদ্দ নিয়ে আত্নসাত করা হয়েছে। এলাকাবাসীর দাবী ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠানে বিভাবে সরকারী অর্থ বরাদ্দ হয়। ‘মানিক পোটল পাকা রাস্তার মসজিদ থেকে চিথুলিয়া ঈদগাহ মাঠ পর্যন্ত’ রাস্তা সংস্কারের নামে কাবিটা প্রকল্পের ৩ লাখ টাকা বরাদ্দ নিয়ে কাজ না করেই পুরো টাকাই উত্তোলন করা হয়েছে। প্রকল্প কমিটির সভাপতি গোশাইবাড়ি ইউনিয়নের ৪নং ওয়ার্ডের সদস্য আব্দুল হাই বলেন, রাস্তা সংস্কারের জন্য কত টাকা বরাদ্দ এবং কত টাকার কাজ করা হয়েছে এ বিষয়ে তিনি কিছুই জানে না। সালাম নামের তার এলাকার এক ব্যক্তি মাষ্টাররোলে স্বাক্ষর নিয়েছে। ধুনট সদর ইউনিয়নের ‘উল্লাপাড়া আজিজুলের দোকান থেকে হলহলিয়া নদী পর্যন্ত’ রাস্তা সংস্কারের জন্য কাবিটা প্রকল্পের বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৪ লাখ ৪৯৯ টাকা। ‘একই রাস্তার উল্লাপাড়া বাবুলের দোকান থেকে আজিমুদ্দিনের বাড়ি পর্যন্ত’ রাস্তা সংস্কার দেখিয়ে কাবিখা প্রকল্পের সাড়ে ৩ লাখ টাকা মুল্যের ৮ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় আজিজুল হক, রেজাউল করিম ও রুপালী খাতুন বলেন, এই রাস্তায় কোন মাটি কাটা হয়নি। রাস্তাটি বর্তমানে চলাচলের অযোগ্য হওয়ায় গ্রামবাসীদের চলাচলে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। একই রাস্তার ওই দুই প্রকল্প কমিটির সভাপতি ধুনট সদর ইউনিয়ের সংরক্ষিত নারী সদস্য ফুলেরা খাতুন বলেন, প্রকল্প দুটিতে কত টাকা বরাদ্দ এবং মাটি কাটা হয়েছে কিনা তা তিনি জানেনই না। তার নিকট থেকে পিআইও অফিসের লোকজন শুধু কাগজে স্বাক্ষর নিয়েছে।
‘সোনামুখি পাকা রাস্তার চৌকিবাড়ী হতে আমিনের বাড়ী পর্যন্ত’ রাস্তা সংস্কারের নামে কাবিটা প্রকল্পের বরাদ্দ দেওয়া ৩ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়েছে কোন কাজ না করেই। একই এলাকার চৌকিবাড়ী জসিম মন্ডলের বাড়ী হইতে রফিক মেম্বারের বাড়ী পর্যন্ত রাস্তা সংস্কারের জন্য কাবিখা প্রকল্পের সাড়ে ৩ লাখ টাকা মূল্যের ৮ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ নিয়েও কোন কাজ করা হয়নি। ওই দুটি প্রকল্পের সভাপতি চৌকিবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের ৪নং ওয়ার্ডের সদস্য রফিকুল ইসলাম বলেন, প্রকল্পে দুটিতে ৬০/৭০ হাজার টাকার কাজ করা হয়েছে। বাকী টাকা কোথায় গেছে তিনি সভাপতি হয়েও এবিষয়ে কিছুই জানেন না। ‘বিলকাজুলী নোটাগাড়ি কালভার্ট থেকে চন্দ্রনাথ সরকারের বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা’ সংস্কারের নামে বরাদ্দ দেওয়া সাড়ে ৩ লাখ টাকা মুল্যের ৮ মেঃ টন চালও উত্তোলন করা হয়েছে কোন কাজ না করেই। ওই রাস্তা দিয়ে প্রতিদিন চালাচলকারী স্কুল কলেজের ছাত্র-ছাত্রী সহ শতশত মানুষকে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। মাঠপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তামান্না আকতার, বিথি খাতুন ও ঋতু খাতুন জানায়, এ রাস্তায় মাটির কাজ না করায় প্রতিদিন কাপড় চোপড় ভিজে স্কুলে যেতে হচ্ছে।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (অতিঃদাঃ) পিআইও আব্দুল আলীম তার বিরুদ্ধে অনিয়ম ও অর্থ আত্নসাতের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, প্রকল্পগুলোতে শতভাগ কাজ সম্পন্ন হয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার রাজিয়া সুলতানা বলেন, ভুয়া প্রকল্পের অনুকুলে অর্থ ছাড় করা সহ টিআর, কাবিখা, কাবিটা প্রকল্পের বেশ কিছু অভিযোগ তিনি পেয়েছেন। এবিষয়ে সরেজমিতে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন।

Facebook Comments (ফেসবুকের মাধ্যমে কমেন্ট করুন)

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
আপনার নাম লিখুন