বগুড়া সংবাদ ডট কম (শেরপুর প্রতিনিধি রায়হানুল ইসলাম) : বগুড়ার শেরপুর উপজেলা যুব উন্নয়ন অফিসের নানা অনিয়ম, দুর্নীতি আর অর্থ আত্মসাত এবং কর্মসংস্থান ও আত্মকর্মসংস্থান প্রকল্পের আওতায় ৪টি ভ্রাম্যমান প্রশিক্ষন কোর্সের ১৬০টি সার্টিফিকেট নদীতে ফেলে দেয়ার ঘটনায় এলাকায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। বিষয়টি প্রকাশ হওয়ার পর সকলপক্ষকে ম্যানেজ করতে মোটা অংকের টাকা নিয়ে মাঠে নেমেছে যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা।
প্রাপ্ততথ্যে জানা যায়, ২০১৪-২০১৫ অর্থ বছরে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর শেরপুর উপজেলা কার্যালয়ে কর্মসংস্থান ও আত্মকর্মসংস্থান প্রকল্পের আওতায় ৪টি ভ্রাম্যমান প্রশিক্ষন কোর্সের অনুমোদনের জন্য আবেদন করা হয়। প্রকল্প ৪টি হলো উপজেলার খানপুর ইউনিয়নের শালফা ওয়েসিস কোচিং সেন্টারে কাঠ মিস্ত্রি প্রশিক্ষন (২১ দিন), সাতারা ব্রাক স্কুলে বাঁশ ও বেতের কাজ বিষয়ক প্রশিক্ষন (২১ দিন), পারভবানীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মোমবাতি তৈরী প্রশিক্ষন (১৪ দিন) ও আলতাদিঘি বোর্ডের হাট ফাজিল মাদরাসায় গরু মোটাতাজাকরন প্রশিক্ষন (৭ দিন)। প্রতিটি প্রশিক্ষন কোর্সে ৪০ জন করে মোট ১৬০ জনের নামের তালিকা প্রেরণ করা হয়। প্রকল্পটি অনুমোদন হওয়ার পর কোন প্রশিক্ষন কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়নি। এই প্রশিক্ষনে বরাদ্দকৃত সম্পূর্ন টাকা আত্মসাত করা হয় এবং ১৬০ জনের নামে ইসুকৃত সার্টিফিকেটগুলো নদীতে ফেলে দেয়া হয়েছে।
অনুসন্ধানে আরো জানা যায়, যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা উপ-পরিচালক দিরাজ চন্দ্র সরকার (চলতি দায়িত্ব) বগুড়ার ছত্রছায়ায় নানা অনিয়ম দুর্নীতি করলেও তার বিরুদ্ধে কেউ কথা বলতে পারবে না। সকলের মাঝে প্রচার রয়েছে উপ-পরিচালক প্রতিমন্ত্রী বিরেন শিকদারের আত্মীয় তাই সকলেই তাকে তোয়াজ করে চলেন। শেরপুর উপজেলা যুব উন্নয়ন অফিসার বিজয় চন্দ্র দাস এই উপজেলায় দীর্ঘ ৭ বছর হলো চাকুরী করলেও তাকে অন্যত্র বদলী হতে হয়নি। আর এই কারনেই যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর শেরপুর উপজেলা কার্যালয়ে কর্মসংস্থান ও আত্মকর্মসংস্থান প্রকল্পের আওতায় ৪টি ভ্রাম্যমান প্রশিক্ষন অনুমোদনের জন্য একটি ভুয়া তালিকা তৈরী করে। অথচ তালিকা তৈরীর পূর্বে সকল প্রশিক্ষনার্থীদের এনআইডি কার্ডের ফটোকপি ও ছবি নেয়ার কথা কিন্তু যেহেতু সবগুলো তালিকাই ভুয়া তাই সেগুলো না নিয়ে নামকাওয়াস্তে ইচ্ছেমত নাম প্রেরন করে।
এ্ই ৪টি প্রশিক্ষনে অংশগ্রহনকারীদের খোঁজনিতে সাংবাদিক সরেজমিনে গেলে আরো নানা তথ্য বেরিয়ে আসে। সাতরা ব্রাক স্কুলে বাঁশ ও বেতের কাজ বিষয়ক প্রশিক্ষনে অংশগ্রহনকারীর তালিকায় ১১ নং ব্যাক্তি বিনোদপুর গ্রামের গোলাম আজমের ছেলে ইমরান আলী জানান, তিনি কখনোই এই প্রশিক্ষন দেননি। এমনকি তার ছবি ও ভোটার আইডি কার্ডের ফটোকপিও তিনি ওই অফিসে দেননি। তালিকায় তার শিক্ষাগত যোগ্যতা দেয়া আছে এইচ এসসি পাশ অথচ তিনি এসএসসি পাশও করেননি। আবার ১২ নং তালিকায় রেফাইতুৃল নামের ব্যাক্তির শিক্ষাগত যোগ্যতা ৮ম শ্রেনী লেখা থাকলেও তিনি মার্স্টাস পাশ।
অপরদিকে তালিকায় ১০ নং ব্যাক্তি জুয়েল রানার ঠিকানায় ওমরপাড়া লেখা হলেও তিনি বিনোদপুরের বাসিন্দা। আর ওমরপাড়ার বাসিন্দা আলমগীর ও শফিকুল ইসলাম হলো সুঘাট ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক। তাদের সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা বলেন, তারা কেন বাঁশ ও বেতের প্রশিক্ষন নেবেন। তাদের বংশে ও গ্রামে কেউ বাঁশ ও বেতের কাজ করেননি।
অনুরুপভাবে কাঠমিস্ত্রি প্রশিক্ষন, মোমবাতি তৈরী ও গরু মোটা তাজাকরণ প্রশিক্ষনের তালিকায় যাদের নাম রয়েছে তারা কেহই এই প্রশিক্ষনে অংশগ্রহন করেননি। এছাড়া প্রশিক্ষনের জন্য যে সকল ভেন্যুর নাম ব্যবহার করা হয়েছে সেখানে কোন প্রশিক্ষন অনুষ্ঠিত হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট ব্যাক্তিরা এই প্রতিবেদককে জানিয়েছেন। মুলত প্রশিক্ষনে ট্রেইনারদের সম্মানীভাতা সহ যে অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছিল তা আত্মসাতের জন্যই এই প্রশিক্ষনের নাটক সাজানো হয়েছিল। আর সার্টিফিকেটগুলো যেহেতু অফিসের বোঝা তাই তিনি দেশের বাড়ীতে যাবার সময় ১৬০টি সার্টিফিকেট নদীতে ফেলে দেন।
উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার কার্যালয়ে গিয়ে প্রশিক্ষনের বিষয়ে জানতে চাইলে যুব উন্নয়ন অফিসার বিজয় চন্দ্র দাস বলেন সকল প্রশিক্ষন যথা নিয়মেই হয়েছে। পরে সাংবাদিকরা রেজিষ্ট্রার বহি দেখতে চাইলে তিনি বলেন অনেক দিনের বিষয় তাই আপনারা ওইগুলো নিয়ে ঘাটাঘাটি না করলেই ভাল হয়, বুঝেনতো সব সময় সব কিছু মেনে চলা যায়না। এক পর্যায়ে তিনি সব কিছু স্বীকার করে বলেন, ৩টি প্রশিক্ষন হয়নি, আর সার্টিফেকেটগুলো হারিয়ে গেছে।
এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী অফিসার সিরাজুল ইসলাম জানান, কেউ অভিযোগ দিলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।

Facebook Comments (ফেসবুকের মাধ্যমে কমেন্ট করুন)

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
আপনার নাম লিখুন