বগুড়া সংবাদ ডটকমঃ বিডি ক্লিন-বগুড়া’র সাফাইঃ দেড় ঘন্টায় ঝকঝকে-তকতকে রেলওয়ে স্টেশন।

বগুড়া শহরে সবচেয়ে নোংরা স্থানগুলোর একটি-রেলওয়ে স্টেশন। সেই রেলওয়ে স্টেশন এলাকাকে মাত্র দেড় ঘন্টায় পরিস্কার করে রীতিমত ঝকঝকে-তকতকে করলো স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘বিডি ক্লিন-বগুড়া’র সদস্যরা। সংগঠনের ৬২জন স্বেচ্ছাসেবী শুক্রবার সকাল সাড়ে ৯টায় পরিচ্ছন্নতা অভিযানে নেমে পড়েন। হাতে গ্লাভস্ আর মাথায় টুপি পড়ে কেউ ঝাড়– হাতে আবার কেউ বেলচা দিয়ে ময়লা তুলতে শুরু করেন। অনেকে আবার পলিথিনের ব্যাগ নিয়ে ময়লা আবর্জনা কুড়াতে শুরু করেন। সংগ্রহ করা ময়লা-আবর্জনাগুলো তারা পৌরসভার আবর্জনাবাহী গাড়িতে জমা করেন।

পরিচ্ছন্নতা অভিযানে শিশু থেকে শুরু করে সত্তর বছর বয়সী নারী-পুরুষও অংশ নেন। বিরল এই দৃশ্য দেখে খোদ স্থানীয় রেলওয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও হতবাক। বেলা ১১টায় পরিচ্ছন্নতা অভিযান শেষে বগুড়া রেলওয়ে স্টেশনের স্টেশন মাস্টার বেঞ্জুরুল ইসলাম জানান, তিনি তার পঁয়ত্রিশ বছরের চাকরি জীবনে কখনোই স্টেশনের প্লাটফর্ম কিংবা সামনের রেল লাইন এলকাকে এমন পরিষ্কার দেখেন নি।

শুক্রবারের ওই পরিচ্ছন্নতা অভিযানে হাজির ছিলেন নগরপিতা বগুড়া পৌরসভার মেয়র অ্যাডভোকেট একেএম মাহবুবর রহমানও। পরিচ্ছন্নতা অভিযান শুরু করার পূর্বে তিনি সংগঠনের সদস্যদের শপথ বাক্য পাঠ করান। ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে পরিচ্ছন্ন দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে প্রায় দুই বছর আগে ঢাকায় ‘বিডি ক্লিন’ নামে একটি সংগঠনের যাত্রা শুরু হয়। বর্তমানে ওই সংগঠন বাংলাদেশের ৪৮টি জেলায় ১৪ হাজার স্বেচ্ছাসেবী কাজ করছে। চলতি বছরের ২৯ জুন বগুড়ায় পরিচ্ছন্নতা অভিযান শুরু করে বিডি ক্লিন-বগুড়ার সদস্যরা।

প্রথম দিন ৩৫জন সদস্য অংশ নেন। তারা শহরের জিরো পয়েন্ট থেকে দুই নম্বর রেল গেট এলাকায় সড়ক এবং ফুটপাত পরিষ্কার করেন। এরপর প্রত্যেক শুক্রবার সকালে সংগঠনটির সদস্যরা ধারবাহিকভাবে বিভিন্ন এলাকায় সড়ক ও ফুটপাতে পরিচ্ছন্নতা অর্থাৎ শহর সাফাই কার্যক্রম চালিয়ে আসছেন। শুক্রবার সকাল ৯টার দিকে স্টেশন এলাকায় পরিচ্ছন্নতা অভিযান শুরু করার কথা ছিল। কিন্তু স্টেশন মাস্টার বেঞ্জুরুল ইসলাম বিলম্বে আসায় ৩০ মিনিট পর শুরু করা হয়।

স্বেচ্ছাসেবীদের বড় একটি অংশ প্লাটফর্মের নিচে রেল লাইনের ময়লা-আবর্জনা পরিস্কার করতে শুরু করেন। অপর একটি অংশ প্লাটফর্মে ঝাড়– দিয়ে আবর্জনাগুলো এক স্থানে জমা করতে শুরু করেন। এরপর সেগুলো বেলচা দিয়ে তুলে পৌরসভার গাড়িতে ফেলা হয়। বিডি ক্লিন-বগুড়ার সদস্য কানিজ রেজা জানান, রেলওয়ে স্টেশন এলাকায় পরিচ্ছন্ন অভিযান চালানো রীতিমত চ্যালেঞ্জিং ছিল। তিনি বলেন, ‘এত ময়লা ও আবর্জনা দেখে আমাদের অনেকেই একটু চিন্তিত ছিলাম। কিন্তু অবাক হয়ে দেখলাম বেশি ময়লা আর আবর্জনা দেখে আমাদের সদস্যরা আরও বেশি সক্রিয় হলেন এবং পরিশ্রমও করলেন। তারা ১ মিনিট বিশ্রামও নেননি।

 

’বগুড়া রেলওয়ে স্টেশন পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে অংশ নিতে বাবা এনজিও কর্মকর্তা অরূপ চক্রবর্তীর সঙ্গে এসেছিল বগুড়া ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল ও কলেজের প্রথম শ্রেণির ছাত্রী অম্বিকা চক্রবর্তী শ্রীময়ী। বড়দের সঙ্গে সেও রেল লাইনের ভেতরের ময়লাগুলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে তুলে পলিথিনের ব্যাগে ভরে। ময়লা আবর্জনা তুলতে খারাপ লাগছে না-এমন প্রশ্নের জবাবে শ্রীময়ী বলে, ‘আমরা তো আমাদের বাড়ি-ঘরের ময়লা-আবর্জনা আমরা নিজেরাই পরিস্কার করি। দেশটাও তো আমার বাড়ির মত। এটাকেও তো পরিষ্কার করতে হবে।

’ বিডি ক্লিন-বগুড়ার সমন্বয়ক ফেরদৌস ওয়াহিদ সুমন জানান, দিন যত যাচ্ছে বিডি ক্লিন-বগুড়ার সদস্য সংখ্যা যেমন বাড়ছে তেমনি পরিচ্ছন্ন কার্যক্রমে অংশগ্রহণকারীদের উপস্থিতিও তেমন বাড়ছে। তিনি জানান, বিডি ক্লিন-বগুড়ার সদস্যরা শহর সাফাই কার্যক্রমের পাশাপাশি শহরবাসী বিশেষত ভ্রাম্যমাণ দোকান মালিকদের পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে সচেতন করার কাজও চালিয়ে যাচ্ছেন। ওই সংগঠনের মুখপাত্র আকবর আহমেদ জানান, বিডি ক্লিন-বগুড়া সদস্যদের ফেসবুকে একটি চ্যাটিং গ্রুপ রয়েছে। সেখানেই তারা একে অপরের সঙ্গে আলাপ করে পরবর্তী শুক্রবার শহরের কোন এলাকায় পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানো হসে সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়াহয়। এরপর ফেসবুকে ইভেন্ট ক্রিয়েট করে পোস্ট দেওয়া হয়। পরে সেগুলো শেয়ার করা হয়। এতে পুরনোদের পাশাপাশি নতুনরাও জানতে পারে এবং অংশ নেন।

স্বেচ্ছাসেবী ওই সংগঠনের সদস্যরা জানান, বিডি ক্লিন-বগুড়ার এই কার্যক্রমে অভিভূত হয়ে বগুড়ার জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ নূরে আলম সিদ্দিকী শহরটিকে পরিচ্ছন্ন হিসেবে গড়ে তুলতে সংগঠনের সদস্যদের আরও বড় পরিসরে কাজ করার পরামর্শ দিয়েছেন। পাশাপাশি তিনি বিডি ক্লিন-বগুড়ার শহর সাফাই কার্যক্রমের সঙ্গে স্থানীয় পৌরসভা এবং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাষ্ট্রিকেও যুক্ত করেন। বিডি ক্লিন-বগুড়ার মুখপাত্র আকবর আহমেদ জানান, তাদের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে পৌরসভা কর্তৃপক্ষ প্রত্যে শুক্রবার পরিচ্ছন্নতা অভিযান চলাকালে আবর্জনা সংগ্রহ করে নির্দিষ্ট স্থানে ফেলার জন্য আবর্জনাবাহী ভ্যান ও ট্রাক সরবরাহ করতে সম্মত হন।

এছাড়া বগুড়া চেম্বার অব কমার্স কর্তৃপক্ষ ময়লা-আবর্জনা সংরক্ষণের জন্য ঝুড়ি (অস্থায়ী ডাস্টবিন হিসেবে ব্যবহার করা যায়) সরবরাহ করছেন।বিডি ক্লিন বগুড়ার সবচেয়ে প্রবীণ সদস্য মুক্তিযোদ্ধা সরিফুল মাসুদ জানান, তাদের এ সাফাই কার্যক্রমে ইতিমধ্যে বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের সদস্য শফিউল ইসলামও যুক্ত হয়েছেন। তিনি বলেন, ‘বগুড়ার কৃতি সন্তান বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের নির্ভরযোগ্য বোলার শফিউল ইসলাম কোরবাণী ঈদের দু’দিনের মাথায় ২৪ আগস্ট শুক্রবার শহরের জিরো পয়েন্ট সাফাই কার্যক্রমে অংশ নেন।

শফিউল ইসলাম আমাদের কথা দিয়েছেন বগুড়ায় এলেই তিনি পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে অংশ গ্রহণ করবেন।’ বিডি ক্লিন-বগুড়ার পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের প্রশংসা করেছেন বগুড়া পৌরসভার মেয়র অ্যাডভোকেট একেএম মাহবুবর রহমান। তিনি বলেন, ‘এই সংগঠনের ছেলে-মেয়েরা শহরকে পরিচ্ছন্ন করার জন্য নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। এখানে সব বয়সী মানুষ আছে। সবাই শহরকে সুন্দর করার কাজে নেমেছে। তাদের কাজে আমরা অভিভুত। তাই আমরাও তাদেরকে সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছি। আশাকরি বগুড়া শহরকে খুব শিগগিরই পরিচ্ছন্ন একটি শহর হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব হবে।’

Facebook Comments (ফেসবুকের মাধ্যমে কমেন্ট করুন)

১টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
আপনার নাম লিখুন