বগুড়া সংবাদ ডটকম (সাগর খান, আদমদীঘি প্রতিনিধি) :বাংলাদেশে রেলওয়ের একটি ঐতিহ্যময়, প্রাচীন ও বৃহত্তম স্টেশন সান্তাহার জংশন স্টেশন। ১৮৭৮ ইং সালে বৃটিশ আমলে নির্মিত এই জংশন স্টেশনটি শুধু ব্রড গেইজ লাইনে চলাচলের সময় এটি শুধু ’সান্তাহার স্টেশন’ নামে পরিচিত ছিল। অবিভক্ত ভারতের উত্তরবঙ্গ ও আসাম, ত্রিপুরা ও নাগাল্যান্ডের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের কলকাতার যোগাযোগ সহজতর করার লক্ষ্যে সান্তাহার কে সংযুক্ত করে পূর্ব দিকে আরো একটি রেল লাইন মিটারগ্রেজ নির্মান কাল ১৯০০ ইং সালে নির্মিত হলে সান্তাহার স্টেশন সান্তাহার জংশন স্টেশনে পরিনত হয়।

ত্রিমুখি রেলের সংযোগ স্থল এবং দুই জেলার মোহনায় অবস্থিত এই স্টেশনটির নানা দিক দিয়ে গুরুত্বপূর্ন। এই স্টেশন থেকে সরকারের আয় উল্লেখ করার মতো। ২০১৭-১৮ অর্থ বছরে এই স্টেশনের মোট আয় ১০ কোটি ১৫ লক্ষ ৩৫ হাজার ১৯৯ টাকা। এই বিপুল পরিমান আয় হওয়া সত্বেও জনবল সংকট, স্টেশনের সীমানা প্রাচীর না থাকা, পানির সমস্যা, অবকাঠামো বিভিন্ন সমস্যার কারনে স্টেশনটি তার ঐতিহ্য হারাতে বসেছে।

সান্তাহার স্টেশন মাষ্টারের অফিস সূত্রে জানা গেছে, এই রেলওয়ে স্টেশনটির ওপর দিয়ে প্রতিদিন ৩০ টির মতো আন্ত:নগর, মেইল, সাধারন ট্রেন চলাচল করে। প্রয়োজনের তুলনায় বর্তমানে চরম জনবল সংকটে স্টেশনটি। বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে সহকারী স্টেশন মাষ্টারের পদ ১৩ টি থাকলেও এখানে কর্মরত আছেন মাত্র ৮ জন। অনেক সময় পোটার দ্বারা এই পদের কাজ সম্পূর্ণ করতে হয়। জামাদারের পদ আছে ৪টি, কর্মরত ১ জন। পয়েন্টস ম্যান পদ সংখ্যা ৯ টি, কর্মরত ৮ জন।

গেট কিপারের পদ আছে ৬ টি তার মধ্যে একজন স্থায়ী ভাবে বাকীরা চুক্তি ভিত্তিক। স্টেশনটির মোট মঞ্জুরী পদ সংখ্যা ৫৯ টি, বর্তমানে কর্মরত আছে ২৬ জন। ৩৩ টি পদই শূণ্য অবস্থায় আছে। প্রথম শ্রেনী পুরুষ ও মহিলা বিশ্রামাগারে ২ জন আয়া থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে দুইটি পদই শূণ্য। একজন আছে চুক্তি ভিত্তিক। ২য় শ্রেনী বিশ্রামাগারে কোন আয়া নেই।

বিশ্রামাগারগুলিতে অধিক সময়ে পানি সরবরাহ থাকে না বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিশ্রামাগারগুলিতে আসন ব্যবস্থা অপ্রতুল। স্টেশনটিতে বর্তমানে যাত্রীদের বসার কিছু আসনের ব্যবস্থা হয়েছে। সান্তাহার জংসন স্টেশনটিতে পানির সমস্যা প্রকট। একটি পানির ট্যাপ থাকলেও সেটিও বেশির ভাগ সময়ে নষ্ট থাকে। ফলে যাত্রীদের পানি সমস্যায় ভুগতে হচ্ছে। স্টেশনটিতে এক সময় ’মুসলিম’ ও ’হিন্দু’ নামে দুটি হেটেল থাকলেও বর্তমানে ১টি খোলা। ফলে প্রথম শ্রেনীর এই স্টেশনটিতে যাত্রীদের জন্য তেমন ভালো কোন খাবারের ব্যবস্থা নেই।

প্রথম শ্রেনীর রেলওয়ে এই স্টেশনটিতে গরু, ছাগলের আনাগোনা বৃদ্ধি পেয়েছে। কে বা কারা প্রতিদিন গরু গুলিকে স্টেশনে ছেড়ে দিয়ে যায়। এই নিয়ে দেশের বিভিন্ন জাতীয় পত্র পত্রিকায় সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশ হলেও বিষয়টির কোন সুরাহা হয়নি। এ বিষয়টি নিয়ে উপজেলা মাসিক আইন শৃংঙ্খায় সভায়ও আলোচিত হয়েছে। সান্তাহার জংসন স্টেশনটির পশ্চিশ পাশের রেল লাইনের ১০ থেকে ১৫ হাত দুরে দিয়ে ২০/২২ টি অবৈধ চায়ের দোকান গড়ে উঠেছে। রেলওয়ে আইন অনুসারে রেল লাইনের দশ গজের মধ্যে কোন মার্কেট বা দোকানপাঠ গড়ে উঠলে তা অবৈধ।

এই অবৈধ দোকানের বিষয়টি নিয়ে দেশের বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হলেও অবৈধ দোকানগুলো উচ্ছেদ হয়নি। এই অবৈধ দোকানগুলির কারনে স্টেশনের বৈধ দোকানগুলির ব্যবসা কমে গেছে। স্টেশনটিতে অবৈধ পান, সিগারেটের দোকানের ছড়াছড়ি। স্টেশনটির প্লাটফর্ম নানা খনা খন্দে ভড়া। বিশেষ করে রেলওয়ে জিআরপি থানার সামনে থেকে শুরু করে নানা জায়গায় গর্ত সৃষ্টি হয়েছে। বৃষ্টি হলে নানা সমস্যার সৃষ্টি হয়।

স্টেশনটির কোন সীমানা প্রাচীর না থাকায় বিনা টিকিটের যাত্রীদের সনাক্ত করা যায় না এবং স্টেশনে অবৈধ অনুপ্রবেশকারীরা ঢুকে পড়ে। সান্তাহার জংশন স্টেশনটি নিয়ে বৃহৎ পরিকল্পনার কথা মাঝে মাঝে শোনা যায়। স্টেশনটি জনবল বৃদ্ধি পেলে, এবং কর্তৃপক্ষের সু-নজরে এলে স্টেশনটি তার অতীত ঐতিহ্য ফিরে পাবে বলে সুধিমহল মনে করেন।

এ ব্যাপারে সান্তাহার জংশন স্টেশন মাষ্টার রেজাউল করিম ডালিম বলেন, বাউন্ডারি ওয়াল বা সীমানা প্রাচীর না থাকায় এই স্টেশনটি কাঙ্খিত আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং জনবল সংকট থাকায় ইচ্ছা থাকা সত্বেও কাঙ্খিত সেবা প্রদান করা যাচ্ছে না।

Facebook Comments (ফেসবুকের মাধ্যমে কমেন্ট করুন)

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
আপনার নাম লিখুন