ফিরোজ কামাল ফারুক, নন্দীগ্রাম(বগুড়া)থেকে: বগুড়ার নন্দীগ্রামের নাগর নদের পানি খাল বিলে ছড়িয়ে পরেছে। এতে হঠাৎ বন্যা দেখা দিয়েছে। পানিবন্দী হয়ে পড়েছে দুই ইউনিয়নের প্রায় হাজার খানেক মানুষ। টানা এক সপ্তাহের বৃষ্টি ও উজানের ঢলে নাগর নদ এখন পানিতে ভরে গেছে। নদের কিনারা দিয়ে পানি বিভিন্ন পয়েন্টের উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে বগুড়ার নন্দীগ্রাম উপজেলার ভাটরা ও থালতা মাজগ্রাম ইউনিয়নের শতাধিক পুকুরের মাছ ভেসে গেছে। পানির নিচে ডুবে গেছে আমনের ক্ষেত এবং বীজতলা। কৃষি অফিস বলছে বন্যায় এই উপজেলার ২৫০ হেক্টর (১৮৭৫ বিঘা) জমির আমনের চারা পানির নিচে তলে গেছে। কিন্ত সেই পরিসংখ্যান কৃষকের কাছে কয়েকগুন বেশি। খোজ নিয়ে দেখা গেছে, উপজেলার নাগর নদ দিয়ে ও দৈয়নার খাল ধ্বসে ফসলের মাঠ ও বিভিন্ন গ্রামে পানি প্রবেশ করেছে। এতে উপজেলার দমদমা, চাতরাগাড়ি, নাগরকান্দি, কালিয়াগাড়ী, রুস্তমপুর, মূলকুড়ি, পার-নাগরকান্দি, মাধবকুড়ি, পারশুন, গুলিয়াসহ বিভিন্ন মাঠের আমন ধান এবং বীজতলা ডুবে গেছে। দিন দিন পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় দুটি ইউনিয়নের ২৫ গ্রামের মাঠের বিভিন্ন ফসল, শতাধিক পুকুরসহ আঞ্চলিক সড়কগুলো ডুবে গেছে।
এলাকার চারদিকে এখন পানি থৈ থৈ করছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে হাজার খানেক মানুষ। এছাড়া ভাটরা ইউনিয়নের নাগরকন্দি থেকে বৃষ্ণপুর, কালিয়াগাড়ী থেকে চাতরাগাড়ী, উমাপতিদীঘি, পার-নাগরকান্দি রাস্তা ডুবে গেছে, বাড়িতে পানি প্রবেশ করছে। ভেছে গেছে পুকুরের মাছ, পানির নিচে আমন ধান, সবজির খেত, বীজতলা। এদিকে ভাটগ্রাম ও বুড়ইল ইউনিয়নের ফসলের মাঠ জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। এতে কৃষকরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, উপজেলায় এবার ১৯ হাজার ৮০০ হেক্টর জমিতে আন চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারন করা হয়েছে। আষাঢ় মাসে বৃষ্টি হয়নি। একারণে অনেক কৃষক সেচপাম্প চালু করে খেতে আমনের চারা রোপণ করেন। ইতিমধ্যে ৮০ শতাংশে আমনের চারা রোপণ শেষ হয়েছে। কিন্তু চারা রোপনের পর কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে উপজেলার মাঠঘাট থৈ থৈ। ডুবে গেছে আমনের চারা ও বীজতলা। এছাড়াও এই বন্যায় পানিবন্দি মানুষ তাদের গবাদি পশু নিয়েও বিপাকে পড়েছেন।
সাধারণত নন্দ্রীগ্রামের এইসব এলাকায় বন্যার পানি সহজে প্রবেশ করে না। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, এই বন্যার অন্যতম কারণ বগুড়া-নাটোর মহাসড়কের দুইপাশে নালা ও খাল ভরাট করে বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করেছে কিছু চিহ্নত মানুষ। প্রশাসনের চোখের সামনে এসব নালা দখল করে বড় বড় বিল্ডিং তৈরি হলেও কেউ কোন পদক্ষেপ নেয়নি। ফলে বৃষ্টির পানিতেই এই অঞ্চলে বন্যার সৃষ্টি হচ্ছে এবং সেই বন্যায় প্রান্তিক কৃষকরাই বেশি ক্ষতির শিকার হচ্ছে।
বগুড়া-নাটোর মহাসড়কের দুই পাশের খাস নালা এখনো প্রভাবশালীরা ইচ্ছেমত দখল করে ভরাট করছে। এই রাস্তার দুই পাশ বাণিজ্যক বহুভবন তৈরি হয়েছে যার বেশির ভাগই খাস নালা দখল করেই গড়ে তোলা হয়েছে। ফলে বৃষ্টির পানি বের হওয়ার রাস্তা বন্ধ হয়ে ফসলের জমি তলিয়ে যাচ্ছে। এই উপজেলাকে বগুড়ার শস্যভান্ডার বলা হয়ে থাকে। এখানে কয়েক হাজার হেক্টর জমিতে নিয়মিত বিভিন্ন ফসলের চাষ হয়। প্রায় সময় এই উপজেলার জমিতে কোন না কোন ফসল থেকেই যায়। হাতে গোনা কিছু মানুষের কারণে লক্ষাধিক কৃষক পরিবার অনাকাঙ্খিত বন্যার কবলে পরে সহায় সম্বল হারাচ্ছে।
এস্থানীয় কৃষকদের সাথে কথা বললে তারা প্রশাসনের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, বৃষ্টির পানি মাঠ থেকে বের হওয়ার একমাত্র নালা এখন দখলদারদের কবলে। প্রশাসন কোন দিন এসব দখলদারদের বিরুদ্ধে কোন আইনগত পদক্ষেপ নেয়নি।
গেল বোরো মৌসুমেও এই এলাকায় কয়েক হাজার হেক্টর আধাপাকা ধান বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে ছিলো। সেই সময়েও এই অঞ্চলের কৃষকরা মোটা ক্ষতির শিকার হয়েছিলো। তখনো কৃষকরা গণমাধ্যম কর্মীদের মাধ্যমে এই নলা দখল মুক্ত করার জন্য প্রশাসনের প্রতি জোর দাবী করা হয়েছিলো। কিন্তু কেউ কৃষকের কথা শোনেনি। আবারো ফসল পানিরে নিচে চলে যাওয়ায় হতাশা প্রকাশ করা ছাড়া তাদের আর কিছুই করার নেই।
ভাটরা ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মিজানুর রহমান মাছুম বলেন, এই ওয়ার্ডের অধিকাংশ রাস্তা এখন পানিতে ডুবে গেছে। অনেকের বাড়িতে পানি প্রবেশ করেছে। ভেসে গেছে পুকুরের মাছ। পনির নিচে আমন ধান ও বীজতলা। প্রায় দুই হাজার মানুষ পানিবন্দি।
দমদমা গ্রামের পানিবন্দি নাসরিন বেগম, মোয়াজ্জেম হোসেনসহ অনেকে জানান, এখন বাড়ি ঘরে পানি ঢুকে পড়েছে। আমরা আতঙ্কে রয়েছি। আমাদের কেউ কোন খোজখবর নেয় না। ফসলের মাঠ তলে গেছে।
উপজেলা কৃষি অফিসার মুহা: মশিদুল হক জানান, গত কয়েক দিনের টানা বর্ষণে উপজেলায় জলাবদ্ধতায় আর কিছু এলাকায় পানি বেশি হয়েছে। এতে প্রায় ২৫০ হেক্টর(১৮৭৫ বিঘা) জমির আমন চারা তলিয়ে গেছে। তাদের দৃষ্টিতে এটি বন্যা নয়। তেমন ক্ষতির হবে না বলে জানান এই কৃষি কর্মকর্তা।

Facebook Comments (ফেসবুকের মাধ্যমে কমেন্ট করুন)

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
আপনার নাম লিখুন