বগুড়া সংবাদ ডট কম (আদমদীঘি প্রতিনিধি সাগর খান) : বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলার সর্বত্রই শুধু বোরো মৌসুমে ধানের ফড়িয়া, আড়তদার ও মহাজন সের কেজির মার প্যাঁচে ধান ভেজা ও কাঁচা এই অজুহাতে ‘ফাউ’ নিয়ে এবং ওজনে কারচুপি করে এলাকার কৃষকদের নিকট থেকে শত শত মণ ধান আত্মসাত করে থাকে। আড়তদার এক বস্তা ধান যে দামে ক্রয় করে সেই দামে বিক্রি করলেও তাদের লাভ থাকে। এর নাম হলো সের কেজির মার প্যাঁচ। দেশের শহরাঞ্চলে সকল পরিমাপ কেজিও গ্রাম হলেও উত্তরাঞ্চল জুড়ে ধান চালের বাজার এখনো চলে সের মণের ওজন। সের মণের ওজনে ধান কেনা বেচা না হলেও মেপে নেওয়া হয় কেজির বাট খারায় আর এখানেই হিসাবের মার প্যাঁচে কৃষককে ‘ঠকানো’ হয়। স্থানীয় প্রশাসন যেমন উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ, ইউনিয়ন পরিষদ হাট-বাজার ইজারা দিলেও হাট বাজারের এই অনৈতিক বিষয় গুলো দেখেও দেখেন না। মেট্রিক পদ্ধতির ওজন ব্যবহার না করলে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে জেল জরিমানার বিধান থাকলেও প্রশাসনের লোকবলের অভাবে নিয়মিত এ সব মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয় না। এ এলাকার কৃষকরা ধান ব্যবসায়ীদের এ সব কারচুপি থেকে বাঁচার জন্য প্রশাসনের কর্তা ব্যক্তিদের মৌখিক অভিযোগ করেও কোন ফল পায়নি, কে শোনে কার কথা। মহাজন ও ব্যবসায়ীদের এ সব কারচুপি থেকে বাঁচার জন্য এবং ‘ফাউ’ নেয়া বন্ধ করার জন্য এবার প্রশাসনের সহায়তা কামনা করেছেন ভুক্তভুগি কৃষক সমাজ। বগুড়ার নন্দীগ্রাম উপজেলার বিজরুলের প্রয়াত চারণ কবি মোসলেম উদ্দিন ছন্দ ছড়ায় বলতেন, ‘ধান ফলায় চাষি, লাভ খায় মাসী’। এই ‘মাসী’ হলো আড়তদার মহাজন ব্যবসায়ি ও বড় ভূস্বামী। কবি মোসলেম আরো বলতেন কৃষক ফলায় ধান, ব্যবসায়ি পায় মান। কৃষক কষ্ট করে ফসল ফলালেও তার সঠিক দাম ও সম্মান পায় না। অপরদিকে ব্যবসায়িরা লাভ পায় ও সম্মানিত হয়।
জানা গেছে, আদমদীঘি উপজেলার ৬টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভা মিলে প্রায় ১০ থেকে ১২টি হাট বাজারসহ বিভিন্ন পয়েন্টে পাকা সড়কের ধারে ধান কেনা বেচার হাট বসে। এ সব বিক্রি কেন্দ্র ও হাট বাজার স্থানীয় প্রশাসন প্রতি বাংলা বছরে ইজারা দিয়ে থাকে। এ সব হাট থেকে স্থানীয় প্রশাসন ও হাট ইজারাদাররা টোল পায়। এ থেকে সরকারের লাখ লাখ টাকা আয় হয়। এসব হাট বাজারও বিক্রি কেন্দ্রে ওজন পরিমাপ বাটকারা ‘ফাউ’ বস্তার ওজনের চেয়ে বেশি নেওয়া, অতিরিক্ত টোল আদায় এসব বিষয় দেখা হয় না। এ অঞ্চলে দু’চারটি হাট বাজার ছাড়া প্রত্যেক হাট বাজারও আড়তে কেজির বাটকারায় সেরের ওজনে পরিমাপ করা হয়। কেজি থেকে সেরে পরিবর্তন সহজে সাধারণ মানুষ বুঝে ওঠে না। আড়তদার মহাজন ধান ব্যবসায়িরা তাদের ইচ্ছামত ধান মেপে নেয়। এতে সাধারণ কৃষকদের বলার কিছু থাকে না। এ অঞ্চলে দুই মণে এক বস্তা হিসেবে ধান বিক্রি হয়ে থাকে ওজন দেওয়ার সুবিধার্থে। ৭৫ কেজিতে দুই মণ ধরে এক বস্তা হিসাব করলে কৃষকদের কোন আপত্তি থাকার কথা নয়। কিন্তু আড়তদার মহাজন ও ধান ব্যবসায়িরা কৃষকদের কাছ থেকে ধান কেনার সময় প্রতি মণে কমপক্ষে এক কেজি ফাউ নিয়ে থাকে। এ ধানের দাম আড়তদার মহাজনরা তাদের দেয় না। বরং নানা কায়দায় ওজনের মারপ্যাঁচে ফেলে তারা সাধারণ কৃষকদের কাছ থেকে বছরে হাজার হাজার কেজি ধান আত্মসাত করে থাকে। এর মধ্যে কৃষক তাদের পরিবারে খাবারের জন্য ধান রেখে বাকি ধান বিক্রি করে দেয়। এভাবে আড়তদার মহাজন ও ফড়িয়া ধান ব্যবসায়িরা প্রতি মৌসুমে একই ভাবে কৃষকের কষ্টে অর্জিত ফসল আত্মসাত করে রাতারাতি আঙ্গুল ফুলে হাজার থেকে লাখপতি লাখ থেকে কোটিপতি হচ্ছে। দরিদ্র ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষিরা নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে। এ অঞ্চলে কৃষকদের কোন সংগঠন নেই। আর কৃষকদের সংগঠন নেই বলে প্রশাসনের কর্তা ব্যক্তিরা এসব ওজনের মারপ্যাচ ও কৃষক ঠকানো দেখেও দেখে না। উপজেলার পার্শ্ববর্তী রাণীনগর উপজেলার আবাদপুকুর হাট, আদমদীঘির কুসুম্বী বাজার, কুন্দগ্রাম বাজার, চাঁপাপুর বাজার ও নশরতপুর বাজারে এসব কারচুপি ও ‘ফাউ’ নেয়ার সংস্কৃতি চালু আছে।

Facebook Comments (ফেসবুকের মাধ্যমে কমেন্ট করুন)

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
আপনার নাম লিখুন