বগুড়া সংবাদ ডটকম (শাজাহানপুর প্রতিনিধি জিয়াউর রহমান): বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার প্রায় ১৯ হাজার হেক্টর আবাদী জমির বেশীর ভাগ জমির উপর রয়েছে অবৈধ মাটি ব্যবসায়ীদের ছোট-বড় শতাধিক মাটির পয়েন্ট। যার গভীরতা ১০ ফিট থেকে ৩০ ফিট পর্যন্ত। এই সমস্ত অবৈধ মাটি ব্যবসায়ীদের দৌরত্বে এক দিকে যেমন বিলিন হয়ে যাচেছ কৃষি জমি ও বনায়ন অপরদিকে গভীর গর্তের মৃত্যুকূপের কারণে ভূমিধ্বসের ঝুকিতে রয়েছে উপজেলাবাসি। এছাড়াও দিনে-রাতে অবাধে শত শত মাটির ট্রাক যাতায়াত করায় চরম ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছে উপজেলার ৮৫০ দশমিক ৮২ কিলোমিটার পাকা ও আধাপাকা রাস্তার অধিকাংশ গ্রামীণ জনপদ। ফলে কোটি কোটি টাকা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সরকার। ধুলায় দূষিত হচ্ছে পরিবেশ। নাভীশ্বাস উঠেছে স্কুল, কলেজগামী শিক্ষার্থী, সাইকেল, মটরসাইকেল পথযাত্রী সহ রাস্তার পাশের বাড়ি-ঘরে বসবাসকারীদের। এমতাবস্থায় অবৈধ মাটি ব্যবসায়ীদের দৌরত্বের বিষয়টি ভুক্তভোগীরা উপজেলা প্রশাসনকে বিভিন্ন সময় মৌখিক ভাবে জানানোর পাশাপাশি লিখিত অভিযোগ দেয়ার পরও কঠোর ব্যবস্থা না নিয়ে গত দু’দিনে লোক দেখানো অভিযান চালিয়ে আইওয়াস করে উল্টো প্রকাশ্যে মদদ দিয়ে চলেছে প্রশাসন। ফলে প্রশাসনের প্রতি ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে সাধারন মানুষের পাশাপাশি উপজেলার সুশীল সমাজের নেতৃবৃন্দ। উপজেলার খোট্টাপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল ফারুক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, তার ইউনিয়নের বিভিন্ন স্থানে এক্র-কেভেটর দিয়ে গভীর গর্ত করে মাটি কাটা হচ্ছে। এ মাসের প্রথম দিকে উপজেলা প্রশাসন শুধুমাত্র ভোমরকুটি মাটির পয়েন্টে অভিযান চালিয়ে আইওয়াস করে থেমে গেছে। খলিশাকান্দি মাটির পয়েন্ট থেকে প্রতি রাতে প্রায় ৩০-৪০ টি ট্রাক দিয়ে মাটি কাটা হচ্ছে। বিষয়টি ইউএনও, এসি ল্যান্ড ও ওসিকে জানানো হলে ইউএনও বলেন দেখছি, ওসি বলেন ট্রাক বন্ধ করার অধিকার তার নেই বলে এড়িয়ে যান। শুধু তাই নয় উল্টো মাটি ব্যবসায়ীদেরকে বলে চেয়ারম্যান বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্যবসায়ীরা এসে বলে আমি নাকি ওসিকে ফোন করেছি। আবার আমি ফোন করে দিলেই নাকি মাটির ট্রাক চলবে। আমি রাজনীতি করি, একজন জনপ্রতিনিধি সবার সাথে তালমিলিয়ে চলতে হয়। ব্যবসায়ীরা নিজেদেরই লোকজন। ওসি সাহেবকে ফোন করে বললাম আমি ফোন করে দিলেই যদি ট্রাক চলে তাহলে চলুক ছেড়ে দেন। ট্রাক চলছে। এই যদি হয় অবস্থা তাহলে কোন অবস্থাতেই মাটি কাটা বন্ধ হবে না। চোপীনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়াম্যান মোজাফ্ফর রহমান জানান, বহু কস্টে দৌড়-ঝাপ করে অর্থকড়ি নস্ট করে রাস্তা-ঘাট পুনঃনির্মাণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এসমস্ত মাটির ট্রাকের জন্য আবার সেই রাস্তা-ঘাট নস্ট হয়ে সরকার কোটি কোটি টাকা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। প্রশাসনকেও বলা হয়েছে। বেশি বলতে পারছি না আবার যদি তাদেরকে বলে দেয় তাহলে ঝামেলার সৃষ্টি হবে। চোপীনগর গ্রামের ব্যবসায়ী শাহিনুর ইসলাম শিপলু, আলহাজ্ব আব্দুর রহিম মোল্যা জানান, চোপীনগর মুসলিমপাড়া, কামারপাড়া, কচুয়াদহ সহ ইউনিয়নের বিভিন্ন স্থানে মাটির পয়েন্ট থেকে অবাধে দিনে ও রাতে বেপরোয়া ভাবে ড্রাম ট্রাকগুলো যাতায়াত করছে। প্রশাসন দেখেও দেখছে না। অবৈধ মাটি ব্যবসায়ীরা প্রভাবশালী হওয়া সাধারন মানুষ বাঁধা দেয়ার সাহস পাচ্ছে না। প্রশাসন কোন ব্যবস্থা না নেয়ায় এটায় প্রমানিত হয় যে প্রশাসনের মদদেই এই সমস্ত অবৈধ মাটি ব্যবসায়ীরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। ডেমাজানী জনকল্যাণ সমিতির সাধারন সম্পাদক সাইফুল ইসলাম বিমান এবং ডেমাজানী কমর উদ্দিন ডিগ্রী কলেজের অধ্যক্ষ এএইচএম শফিকুত তারিক মাসুম জানান, গত দু’দিন বন্ধ থাকলেও দীর্ঘদিন যাবত ডেমাজানী হতে ফুলকোট সড়কে প্রতি রাতে ২০-৩০টি মাটির ড্রাম ট্রাক বেপরোয়া ভাবে যাতায়াত করেছে। এতে করে রাস্তা-ঘাট নস্ট হয়েছে। ডেমাজানী এলাকায় রাস্তার পাশে ড্রেনা ভেঙ্গে গেছে। দেশের সম্পদ রক্ষায় সমিতির নেতৃবৃন্দ, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধান, জনপ্রতিনিধিসহ স্থানীয় গন্যমান্য ব্যক্তিবর্গ স্বাক্ষরিত প্রতিষ্ঠান রয়েছে। কি কারণে জাতীয় সম্পদ রক্ষায় প্রশাসন কোন ব্যবস্থা নিচ্ছে না তা বোধগম্য নয়। প্রশাসনের নীরবতাই অবৈধ মাটি ব্যবসায়ীদের ইন্ধন যোগাচ্ছে বলেও জানান তারা। উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার আব্দুল মান্নান ফকির জানান, প্রশাসনকে বহুবার বলা হয়েছে। স্থানীয় সংসদ সদস্যও বিষয়টি জানেন। কেন বন্ধ হবে না। প্রশাসন কেন ব্যবস্থা নেবে এটা মেনে নেয়া যায় না। খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, উপজেলার আড়িয়া বাজার হতে ডেমাজানী-ফুলকোট সড়ক এবং সাজাপুর একটেল টাওয়ারের পাশ দিয়ে সাজাপুর চারমাথা সড়কে কয়েক দিন ধরে ট্রাক যাতায়াত বন্ধ থাকলেও দুবলাগাড়ী হতে চোপীনগর মুসলিমপাড়া-কামারপাড়া সড়ক, দুবলাগাড়ী হতে খলিশাকান্দি সড়ক, দুবলাগাড়ী হতে কচুয়াদহা সড়কে সারা রাত ধরে শতাধিক ড্রাম ট্রাক বেপরোয়া ভাবে যাতায়াত করছে। এসমস্ত ট্রাকের বেশির ভাগ চালক লাইসেন্স বিহিন ও অপ্রাপ্ত বয়স্ক হওয়ায় দূর্ঘটনার সম্ভাবনা অনেক বেশী। বাধা দিতে গিলে প্রভাবশালী ভূমিদস্যুদের ভাড়া করা লোকজনের তোপের মুখে পড়তে হচ্ছে স্থানীয়দের। এইচএসসি পরিক্ষা চলছে, রাতে ঘুমের ব্যঘাত ঘটছে, পথ চলাচলে অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। ইউএনও কে বললে বলছেন ইউএনও সব পারে না। ইউএনও’র একার পক্ষে বন্ধ করা সম্ভব নয়। ওসি কে বললে বলছেন মটির ট্রাক বন্ধ করা পুলিশের কাজ নয়। উপরোন্ত ব্যবস্থা নেয়া দুরে থাক উল্টো ব্যবসায়ীদেরকে জানিয়ে প্রতিবাদি মানুষদেরকে হুমকির মুখে রাখছে। এমতাবস্থায় প্রশাসনের নীরবতাই এই সমস্ত অবৈধ মাটি ব্যবসায়ীদেরকে মদদ যোগাচ্ছে বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন উপজেলার সুশীল সমাজের নেতৃবৃন্দ। পাশাপাশি ক্ষিপ্ত হয়ে উঠছে সাধারন মানুষ।

Facebook Comments (ফেসবুকের মাধ্যমে কমেন্ট করুন)

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
আপনার নাম লিখুন