বগুড়া সংবাদ ডট কম (শাজাহানপুর প্রতিনিধি জিয়াউর রহমান) : চারিপাশে মৃত্যুকূপ ধ্বসে যাচ্ছে বগুড়ার শাজাহানপুর। ২২১ দশমিক ৮ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের এই উপজেলায় মোট আবাদী জমি পরিমান প্রায় ১৯ হাজার হেক্টর। যেখানে রয়েছে ১৮৭টি জলমহাল। আর এই বিশাল আয়তনের বেশীর ভাগ আবাদী জমির উপর রয়েছে অবৈধ মাটি ব্যবসায়ীদের ছোট-বড় শতাধিক মাটির পয়েন্ট। যার গভীরতা ১০ ফিট থেকে ৩০ ফিট পর্যন্ত। এই সমস্ত অবৈধ মাটি ব্যবসায়ীদের দৌরত্বে এক দিকে যেমন বিলিন হয়ে যাচেছ কৃষি জমি ও বনায়ন তেমনি শতাধিক মৃত্যুকূপের কারণে ভূমিধ্বসের ঝুকিতে রয়েছে উপজেলাবাসি।
এছাড়াও রাতে-দিনে অবাধে শত শত মাটির ট্রাক যাতায়াত করায় চরম ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছে উপজেলার ৮৫০ দশমিক ৮২ কিলোমিটার পাকা ও আধাপাকা রাস্তার অধিকাংশ গ্রামীণ জনপদ। ফলে কোটি কোটি টাকা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সরকার। ধুলায় দূষিত হচ্ছে পরিবেশ। নাভীশ্বাস উঠেছে স্কুল, কলেজগামী শিক্ষার্থী, সাইকেল, মটরসাইকেল পথযাত্রী সহ রাস্তার পাশের বাড়ি-ঘরে বসবাসকারীদের।
অপরদিকে অবৈধ মাটি ব্যবসায়ীদের এই দৌরত্বের বিরুদ্ধে সংশ্লীষ্ট দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দেয়া হলেও অজ্ঞাত কারণে কোন প্রকার আইনগত ব্যবস্থা না নিয়ে জেগে ঘুমিয়ে রয়েছে প্রশাসন। ফলে প্রশাসনের প্রতি দেখা দিয়েছে অসন্তোষ, ঘটছে মারপিটের ঘটনাও।
সরেজমিন খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, উপজেলার সাজাপুর সোনারপাড়া এলাকায় ১৫-১৬ বিঘা জমি থেকে এসকেভেটর দিয়ে ২৫-৩০ ফিট গভীর গর্ত করে মাটি কাটা শেষ করে বর্তমানে বিট মাটি উত্তোলন করা হচ্ছে। এনিয়ে এক সপ্তাহ পূর্বে মারপিটের ঘটনায় এসকেভেটর চালক সহ ২ জন গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে।
নয়মাইল জামালপুর এলাকায় ফসলী জমির উপর দিয়ে মাটির পয়েন্টের রাস্তা না দেয়ায় ফসল কেটে নষ্ট করা এবং মারপিট ও হত্যার হুমকির অভিযোগে থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে।
রাধানগর হিন্দুপাড়া এলাকা থেকে মাটি কেটে অবাধে ট্রাক যাতায়াতের কারণে আড়িয়া বাজার হতে ডেমাজানী, ফুলকোট, রাধানগর রাস্তা ক্ষতিগ্রস্তের হাত থেকে বাঁচাতে ডেমাজানী জনকল্যাণ সমিতির পক্ষ থেকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর লিখিত অভিযোগ দেয়া হয়। যার অনুলিপি জেলা প্রশাসক সহ সংশ্লীষ্ট দপ্তরে প্রেরণ করা হয়েছে। অথচ এখন পর্যন্ত কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।
সমিতির সাধারন সম্পাদক সাইফুল ইসলাম বিমান এবং ডেমাজানী ডিগ্রী কলেজের অধ্যক্ষ এএইচএম শফিকুত তারিক মাসুম জানান, দেশের সম্পদ রক্ষায় প্রশাসনের কাছে অভিযোগ করেছিলাম। সমিতির নেতৃবৃন্দ, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধান, জনপ্রতিনিধিসহ স্থানীয় গন্যমান্য ব্যক্তিবর্গ স্বাক্ষরিত অভিযোগ দেয়ার পরও প্রশাসনের কাছে গুরুত্ব পায়নি বিধায় এখন পর্যন্ত কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। অথচ এ এলাকায় জাতীয়করণে প্রধানমন্ত্রির স্বিকৃতিপ্রাপ্ত ডেমাজানী ডিগ্রী কলেজ, প্রাচীনতম কাচারীবাড়ি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সহ গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তাই অভিযোগ আমলে নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে প্রশাসনের প্রতি অনুরোধ জানান তারা।
ইতিপূর্বে সুজাবাদ বাঁচাও আন্দোলন কমিটি বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে আন্দোলন করেও প্রশাসনের সহায়তা না পেয়ে সুজাবাদ এলাকাকে ভূমিদস্যূর হাত থেকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছেন বলে জানিয়েছেন কমিটির নেতৃবৃন্দ।
এছাড়াও উপজেলার খলিশাকান্দি এলাকায় ৩টি, দোগলাপাড়ায় ২টি, মোস্তাইল এলাকায় ৩টি, ভোমরকুটি এলাকায় ১টি, ভান্ডারপাইকা এলাকায় ৩টি, খোট্টাপাড়া এলাকায় ২টি, জালশুকা খাউড়া এলাকায় ৪-৫টি, চোপীনগর এলাকায় ২টি, শাহনগর এলাকায় ১টি, কামারপাড়া দড়িপাড়া ও ঠোসাপুকুর এলাকায় ২টি, কচুয়াদহ ২টি, সাজাপুর জায়দারপাড়া, কাটনারপাড়া ও বাটেপাড়া এলাকায় ৩টি, ডোমনপুকুর দেওয়ানপাড়া এলাকায় ১টি, সুজাবাদ এলাকায় ২টি, বারআঞ্জুল এলাকায় ২টি, চকজোড়া এলাকায় ১০-১২টি, শাজাহানপুর উপজেলাধিন বগুড়া পৌরসভার ২১ নং ওয়ার্ড হেলেঞ্চাপাড়া এলাকায় ২টি, সহ উপজেলার বিভিন্ন স্থানে ছোট-বড় শতাধিক মাটির পয়েন্ট রয়েছে। যেখানে এসকেভেটর দিয়ে ১০ ফিট থেকে ২৫-৩০ ফিট পর্যন্ত গভীর গর্ত করা হয়েছে। সুজাবাদ এলাকায় মাটির পয়েন্ট নিয়ে ইতিপূর্বে মারপিটের ঘটনাও ঘটেছে।
স্ব স্ব এলাকায় সরকারদলীয় প্রভাশালী ব্যক্তিরাই এই সমস্ত মাটি ব্যবসার সাথে জড়িত। যার কারণে সাধারন মানুষ তাদের বিরুদ্ধে কথা বলতে সাহস পায় না।
উপজেলা প্রকৌশলী ইসমাইল হোসেন সাংবাদিকদের জানান, গ্রামীণ জনপদের পাকা রাস্তাগুলো ১০টন ওজন ধারন ক্ষমতা সম্পন্ন। সেখানে প্রতিনিয়ত অহরহ মাটি বোঝাই ট্রাক যাতায়াত করলে রাস্তার স্থায়ীত্ব থাকবে না এটাই স্বাভাবিক।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আহসান শহিদ সরকার জানান, আবাদী জমির উপরের অংশ (টপ সয়েল) বিক্রি করতে পারবে না। বিষয়গুলি ইউএনও মহোদয়কে জানানো হয়েছে। মাসিক মিটিংয়েও আলোচনা করা হয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ কামরুজ্জামান বলেন, অভিযোগের প্রেক্ষিতে এসিল্যান্ড ও পুলিশ প্রশাসন একাধিকবার ট্রাইল দিয়েছেন। অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ৩-৪টি স্থানে ড্রাইভও দেয়া হয়েছে। তাছাড়া এই সমস্যার সমাধান করা একার পক্ষে সম্ভব নয়। জনসচেতনতা বাড়াতে সার্বজনিন ভাবে ক্যাম্পেইন করতে হবে। এছাড়া বিক্ষুব্ধ লোক যারা মাটি কাটছে তাদের বিরুদ্ধে যেন মামলা করে। এটি আইনের ভার্ষন। লোকাল প্রশাসন হিসেবে অভিযান অব্যাহত রয়েছে এবং থাকবে।
পরিবেশ অধিদপ্তর রাজশাহী বিভাগীয় কার্যালয় বগুড়ার পরিচালক আশরাফুজ্জামান জানান, এ বিষয়ে কেউ কোন আবেদন জানাননি। কোন ভাবে জানতে পারলে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।
উল্লেখ্য, ২০০২ সালে প্রতিষ্ঠিত শাজাহানপুর উপজেলার ২০০১ সালের আদম শুমারী অনুযায়ী জনসংখ্যার পরিমান ২,৮৯,৮০৪ জন। ৯টি ইউনিয়ন পরিষদ নিয়ে গঠিত এ উপজেলায় রয়েছে ১৭৬টি গ্রাম। ২২টি হাট-বাজার। প্রায় ১৯ হাজার হেক্টর ১ ফসলী থেকে ৪ ফসলী আবাদী জমি। জাতীয় মহাসড়ক ছাড়া ৩৫৭ দশমিক ৯৮ কিলোমিটার পাকারাস্তা এবং ৪৯২ দশমিক ৮৪ কিলোমিটার আধাপাকা রাস্তা। সরকারী বেসরকারী স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা সব মিলিয়ে মোট শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে ২০৫টি। শিল্প কারখানা, ক্ষুদ্র শিল্প, কুটির শিল্প, টেক্রটাইল মিল ও পোল্ট্রী ফিড মিল রয়েছে মোট ৬৩১টি। দুগ্ধ খামার, ছাগল, ভেড়া, হাঁস ও মুরগী খামার সহ পোল্ট্রী খামার রয়েছে মোট ৪৩৫টি। মসজিদ ৫৯৮টি এবং মন্দির ৪৯টি।
এমতাবস্থায় ভূমিদস্যুদের হাত থেকে গুরুত্বপূর্ণ এই উপজেলার কৃষি, বনায়ন, রাস্তা-ঘাট ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় সংশ্লীষ্ট প্রশাসনের প্রতি জোর দাবী জানিয়েছেন উপজেলার সচেতন মহল।

Facebook Comments (ফেসবুকের মাধ্যমে কমেন্ট করুন)

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
আপনার নাম লিখুন